শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে চলছে তীব্র আলোচনা। ডাকসু নির্বাচনের পরই জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরও ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন ঘিরে।
বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র একবারই ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই নির্বাচন ঘিরেও ছিল নানা বিতর্ক, নানা প্রশ্ন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ডাকসু কিংবা কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কারণে অনেক বছর ধরে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ পাননি। আর সে কারণে গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন পটভূমিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘চব্বিশের আন্দোলন শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদেও রয়েছেন। যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ডাকসু নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার পরই গত বছরের জুলাইয়ে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ওই আন্দোলনই এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশেষ করে দুইটি কারণে এবারের ডাকসু নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রথম কারণ অনেকদিন পরে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, দ্বিতীয়ত জুলাই পট পরিবর্তনের পর দেশের মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তার দুয়ার খুলে গেছে। যে কারণে এই নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার একটা অংশ মনে করা হচ্ছে।
এখন থেকে প্রায় চার দশক আগে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদর রহমান মান্না।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলনে ডাকসু সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের ক্রান্তিলগ্নেও ডাকসু নেতৃত্ব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছে। যে কারণে ডাকসুর আবেদন ও গুরুত্ব সব সময় ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।’
রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা?
সর্বশেষ ২০১৯ সালে যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর। ডাকসুতে ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। একই সাথে জুলাই আন্দোলনে তার দলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়ার অতীতে বিভিন্ন সময়ে ডাকসুতে যারা ভিপি-জিএস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদে বিজয়ী হয়েছেন তাদেরও রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গেছে। যে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোও এবার এই নির্বাচনকে অনেক আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘ডাকসু নির্বাচনকে সারাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, এতে কোন সন্দেহ নেই। এই নির্বাচন কমবেশি জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবেই।’’
ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত টকশো, আলোচনা, বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করতে দেখা গেছে।
নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর ছাত্রদল-ছাত্রশিবির-কিংবা প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর মধ্যে নানা অভিযোগ পাল্টা অভিযোগও করতে দেখা গেছে।
জামায়াতের ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারাই পাইওনিয়র হিসেবে কাজ করেছে। যে কারণে সফল গণঅভ্যুত্থানের পরও ওই নেতৃত্বের মধ্যে নির্বাচন তো স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হবেই।’’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘‘২০১৯ সালে ডাকসুর শীর্ষ নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে কোটা আন্দোলন থেকে। সেই কোটা আন্দোলন থেকেই ২০২৫ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। সুতরাং ডাকসু আগামী দিনের রাজনীতির বড় নিয়ামক সেটা বলাই যায়।’’
এর বাইরে আরেকটা বিষয়কে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আগামী পাঁচ মাস পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে এবারের ডাকসু নির্বাচন সরকারের জন্য একটা রিহার্সাল। যে কারণে এটার প্রতি সবার নজর।









