সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ওটিটি প্লাটফর্মে সাধারণে উচ্চারণ-অযোগ্য সংলাপের সময় শব্দটি পুরো না শুনিয়ে ‘টুঁ-টুঁ’ জাতীয় আওয়াজ শোনানো হয়। যে শব্দগুলোর জন্য ওইরকম ‘টুঁ-টুঁ’, সেসব শব্দ ব্যবহার করে সম্প্রতি একাধিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের স্লোগান দিতে দেখা গেছে। কিছু রাজনৈতিক বক্তৃতাতেও শোনা গেছে ওইসব অশ্লীল শব্দ।
হঠাৎ করে কেন এরকম শোনা যাচ্ছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতি যখন অশ্লীল স্লোগান নির্ভর হয়ে পড়ে, তখন সেখানে আদর্শের স্থান দখল করে বিদ্বেষ, যুক্তির জায়গা নেয় গালিগালাজ। সতর্ক করে তারা বলেছেন, এমন স্লোগান সামাজিক অনিয়ম ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। ।
‘সুক্ষ্ন দাগে মুন্সিয়ানা’ এখন দেখা যায় না
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা এক ধরনের অসহিষ্ণুতা।
তিনি বলেন: রাজনৈতিক গভীরতার অস্পষ্টতা থাকলে এমনটা হতে পারে। সমালোচনা ও বিরোধিতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তাৎপর্য না থাকলে গালিগালাজ হয়। এটা সামগ্রিক গণতন্ত্রের অভাব। আমাদের সমাজে উত্তেজনা, ফাঁকা আওয়াজ, বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা জারি আছে। সেটার প্রকাশ আমরা ফেসবুকে দেখতে পাই।
‘‘আমরা আগে সুক্ষ্ন দাগে সভা-সমাবেশে বক্তৃতার করার মুন্সিয়ানা দেখাতাম, যেটা এখন আর নেই’ বলে যোগ করেন তিনি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘সভা ও বক্তৃতায় অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণহীন রাজনৈতিক তারল্য।
”নেতা, কর্মী, ছাত্রদের প্রতি দলের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচীর অভাবের ফলে এমনটা হচ্ছে। যারা এই গালিগালজ গুলো করতে তারা কোনো না কোনো দলের পক্সি হিসেবে কাজ করছে,’’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিপ্লবীরা ‘গালিগালাজ’কে অস্ত্রের জায়গায় নিয়েছিল
তবে এরকম ভাষার ব্যবহার নিয়ে কিছুটা ভিন্নরকম বক্তব্যও আছে। যেমনটা বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রিফাত রশিদ।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তৃতা ও স্লোগানে অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ সাধারণ নিয়মে আমাদের সাথে যায় না। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সুশীলতার মোড়কে ফ্যাসিবাদের কাঠামো তৈরি করেছিল। জুলাইতে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদকে উপড়ে ফেলতে আমাদের বিপ্লবীরা গালিগালাজকে একটা অস্ত্রের জায়াগায় নিয়ে গিয়েছিল। এটা একটা প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। আরেকটি ‘হিপহপ’ ক্যালচার।

”এই ক্যালচারের র্যাপ গানে কিছুটা অশ্লীলতা থাকে। শুধু আমাদের দেশে না, প্রত্যেক দেশের র্যাপ গানে এমনটা থাকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে র্যাপ সঙ্গীত এগিয়ে এসেছিল। আমাদের দেশের তরুণ দুই র্যাপার হান্নান হোসাইন শিমুল এবং মোহাম্মদ সেজান এ জন্য জেলও খেটেছে। কালচারের পরিবর্তন হয়েছে। হিপহপ ক্যালচারের ভাষা ও জুলাইয়ের স্লোগান স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সুশীলতার মোড়ক ভেঙ্গে দিয়েছিল। সেই স্লোগানগুলো এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে,” বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনীতি করতে প্রকৃত শিক্ষা লাগে স্যার! শুধু সার্টিফিকেট নয়!
রাজনৈতিক বক্তৃতা ও স্লোগানে অশ্লীল শব্দের ব্যবহারে অনেকে শুধু পীড়িত হলেও প্রতিবাদীও হয়েছেন অনেকে।
জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাহনাজ খুশি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, আগে স্লোগান শুনলেই দেশের জন্য মন উত্তাল হয়ে উঠত। বিভিন্ন দলের আদর্শ প্রকাশ পেত তাদের মিছিল ও স্লোগানে। কিন্তু এখন স্লোগান শুনলে দ্রুত ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে চারপাশে কেউ আছে কি না দেখে নেন।
”বাচ্চা, বয়োজ্যেষ্ঠরা পাশে থাকলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়! ছি:! কী ভাষা!”
অভিনেত্রী জানান, সম্প্রতি অনেক অসভ্য স্লোগানের সঙ্গে একটি নতুন স্লোগানও যুক্ত হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সারা দুনিয়া দেখেছে। তিনি লেখেন, ”এই আমাদের দেশ!! কারও কিচ্ছু যায় আসে না। রাজনীতি করতে শিক্ষা লাগে স্যার! সেটা প্রকৃত শিক্ষা, শুধু সার্টিফিকেট নয়! আক্রোশ দিয়ে কিছু দিন ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, মানুষ ধরে রাখা যায় না! অবশ্য মানুষ এখন আর লাগেও না! মানুষকে আর কে ভাবছে?”
করণীয় কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইক্যোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘অপছন্দের জিনিস প্রকাশ্যে দেখতে থাকলে সেটার জনপ্রিয়তা বাড়ে।

”এই জনপ্রিয়তা সোশ্যাল মিডিয়াতেও পুঁজি করে স্বাভাবিক হতে থাকে এবং প্রতিবন্ধকতা কেটে যায়। আমাদের দেশের টিভি নাটকে অশালীন ভাষার ব্যবহার হচ্ছে, ভাষা বিকৃত হচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না। এসব ভাষার ব্যবহার থেকে রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক থাকা উচিত।’’
ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘দলীয় নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাঠচক্রের ব্যবস্থা করতে হবে। দলীয় আদর্শটা তৃণমূল পর্যন্ত যাতে পৌঁছায় সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এই বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা যাতে করে ওই দলগুলোকে তারা গালিগালাজের জন্য কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিতে পারে এবং প্রয়োজনে দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারে।’

সহমত প্রকাশ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যের প্রতি বিবেচনাবোধ বাড়াতে হবে।’
বিপ্লবোত্তর স্পিরিট, সময়ের পরিক্রমায় শেষ হবে
রিফাত রশিদ বলেন, ‘‘ট্রাডিশন্যাল রাজনীতিবিদ যারা রয়েছেন তারা এখনো রাজনীতির এই পরিবর্তনটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির ভাষার পরিবর্তন হচ্ছে, রাজনীতির ব্যবহারের পরিবর্তন হচ্ছে, এটা বিপ্লবোত্তর একটা স্পিরিট। ’’
তিনি বলেন, ‘‘স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা অধিকার আদায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় রাজাকারের নাতিপুতি বলে গালাগাল করেছেন, সেটাকে কাউন্টার দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা ‘তুই রাজাকার’-এর মতো শব্দ চয়ন করেছিল।’’
তিনি বলেন: এরপরে আমরা দেখতে পেয়েছি গালিগালাজ প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। এটাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখছি না। বৈপ্লবিক অবস্থা চলমান রয়েছে। এটা সময়ের পরিক্রমার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাবে।









