ক্যারিয়ারে মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় প্লেব্যাক গান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ভক্ত ও সংগীতজগৎকে চমকে দিয়েছেন অরিজিৎ সিং। মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে একাধিকবার ভারতের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী জানান, তিনি আর নতুন কোনো সিনেমার গানে কণ্ঠ দেবেন না।
দীর্ঘদিনের যাত্রায় সঙ্গে থাকার জন্য শ্রোতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি প্লেব্যাক গানের ইতি টানেন! অরিজিতের এমন চমকে দেয়া ঘোষণা তখন আসলো, যখন ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’ সিনেমার জন্য শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে গাওয়া তার গান ‘মাতৃভূমি’ সবে মাত্র প্রকাশিত হলো!
অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত কেন? তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার ব্যক্তিগত এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট বলে দাবি করা একটি পোস্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি লেখেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এমন কিছু ভাবছিলেন।
অরিজিতের ভাষায়,“আমি খুব দ্রুত বোর হয়ে যাই। তাই একই গান লাইভে গাওয়ার সময় বারবার নতুন অ্যারেঞ্জমেন্ট করি। একসময় বুঝেছি, আমি আসলে এই কাঠামোর ভেতরে আটকে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত সাহস করে সিদ্ধান্তটা নিলাম।”
প্লেব্যাকে অরিজিতের যাত্রা যেভাবে
২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ রিয়েলিটি শো দিয়ে সংগীতজগতে পথচলা শুরু করেন অরিজিৎ সিং। যদিও সে প্রতিযোগিতায় তিনি ফাইনালে পৌঁছাতে পারেননি। ২০১০ সালে তেলুগু সিনেমা ‘কেদি’ দিয়ে তার প্লেব্যাক অভিষেক হলেও বলিউডে বড় ব্রেক আসে ২০১১ সালে ‘মার্ডার ২’ সিনেমার গান ‘ফির মহব্বত’ দিয়ে। আর ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আশিকি ২’ তাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
এ পর্যন্ত সিনেমা ও একক মিলিয়ে ৮০০টির বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন অরিজিৎ সিং। গড়ে বছরে ৫০টিরও বেশি গান! পাশাপাশি দেশ–বিদেশে টানা লাইভ শো ও ট্যুরে ব্যস্ত থেকেছেন তিনি। গত দেড় দশকে এমন কোনো বছর ছিল না, যখন শ্রোতারা তার কণ্ঠ শোনেননি।
বলিউড থেকে দূরত্বের কারণ
মুর্শিদাবাদের সাধারণ জীবনধারায় বেড়ে ওঠা অরিজিৎ সিং কখনোই বলিউডের ঝলমলে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না। মিডিয়া উপস্থিতি, পার্টি বা সামাজিক আড্ডা- সবকিছু থেকেই বরাবর দূরে থেকেছেন তিনি। মায়ের মৃত্যু শোক তাকে আরো ঘরকুনো করে ফেলে! নিজের শহরের স্টুডিওতেই বেশিরভাগ কাজ সেরে নিতেন, প্রয়োজন হলে তবেই যেতেন মুম্বাইয়ে।
ঘনিষ্ঠদের মতে, দীর্ঘ ১৫ বছরের টানা কাজ, খ্যাতি ও অর্থ- সবকিছু অর্জনের পর শিল্পীর ভেতরে একধরনের ক্লান্তি কাজ করাই স্বাভাবিক। সিনেমার গান মানেই নির্মাতা, প্রযোজক, বাজার ও গল্পের নানা সীমাবদ্ধতা। একসময় শিল্পী নিজের মতো করে সৃষ্টির স্বাধীনতা খুঁজতে চান- অরিজিতের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
গান ছাড়ছেন না, শুধু সিনেমার গান থেকে বিদায়
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অরিজিৎ সিং সংগীত থেকে সরে যাচ্ছেন না। তিনি শুধু সিনেমার গান গাওয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। যাতে নিজের শর্তে, নিজের মতো করে সংগীত সৃষ্টি করতে পারেন।
সবশেষ পোস্টে তিনি লেখেন,“আমি আর নতুন কোনো প্লেব্যাক অ্যাসাইনমেন্ট নেব না। এটাকে বিদায় বলা যায়। যাত্রাটা ছিল অসাধারণ।”
ভক্তদের একাংশ যেখানে শোকাহত, সেখানে অনেকে মনে করছেন- এটি শেষ নয়, বরং অরিজিৎ সিংয়ের সংগীতজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। স্বাধীন সংগীতের জগতে তার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে- এমন আশাও করছেন অনেকে।
সব জল্পনা–কল্পনার উত্তর অবশ্য সময়ই দেবে। আর সেই উত্তর আসবে অরিজিৎ সিংয়ের নিজস্ব কণ্ঠেই। যে কণ্ঠ ছাড়া একটি দিন কল্পনাও করতে পারেন না তার অগণিত শ্রোতা। এনডিটিভি









