সরকারের পদত্যাগের ১ দফা দাবিতে বিএনপি আবারও ২ দিনের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বর (রবি ও সোমবার) দেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধ পালন করবে তারা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। প্রশ্ন হলো, এভাবে আন্দোলন করে দাবি আদায় কি হবে?
হরতাল বা অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতা মানেই হলো জনগণের ক্ষতি। শুধু জনগণের ক্ষতি বললে ভুল হবে, সারাদেশে গুমোট অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থিরতা একমুখী নয়, বহুমুখী। শিক্ষা, বাণিজ্য, যোগাযোগ সবক্ষেত্রেই ব্যাঘাত ঘটে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ যা ঘটে তা হলো জনগণের মধ্যে ভয় ঢুকে যায়। এই ভয় সবাইকে তাড়িত করে।
হরতাল-অবরোধের সংস্কৃতি অনেকদিন বন্ধ ছিল এখন নতুন করে শুরু হয়েছে। হরতাল রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল হলেও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি চরম ক্ষতিকর। এই ক্ষতি কেউই চায় না।
হরতাল-অবরোধ ও সহিংস কোনো কর্মসূচি চায় না এফবিসিসিআই। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) বলেছে, বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ডলার-সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ব্যবসায়ী নয়, দৈনিক আয়ের প্রতিটি মানুষই হরতাল-অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতা পছন্দ করে না। এখন থেকে দশ বছর আগে ঢাকা চেম্বারের এক গবেষণায় উঠে আসে—হরতালে একদিনের আর্থিক ক্ষতি হতো ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে অর্থনীতির আকার ৪ গুণ বেড়েছে। ফলে এই সময়ের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষতিও সেই হারেই বাড়বে। ২০২৩ সালের বিবেচনায় এখন সেই ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে, বেড়েছে আর্থিক ক্ষতির পরিসর, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে।
২৮ অক্টোবরের হরতাল, ২৯ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বরের অবরোধ এবং আবার ৫ ও ৬ নভেম্বরের অবরোধে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তাতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সংকট, দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় কাজে না ফিরতে পারার কষ্ট, দৈনিক আয়ের মানুষদের নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করতে না পারার কষ্ট সবাইকে বিপাকে ফেলেছে।
বিএনপি-জামায়াতের ডাকা সারা দেশে তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত পাঁচ জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ৯টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ হলো পাবনার ঈশ্বরদীতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও পাথর ও ইট ছুড়ে মারায় ট্রেনের বাইরের অংশের গ্লাসের ক্ষতি হয়েছে। তবে যাত্রীদের মধ্যে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ভাবুন একবার, মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রীরা যাচ্ছেন ভারতে তারা যদি আহত হতেন তাহলে তাদের যাত্রার কী হতো? আর মাঝপথে তারা কোথায় চিকিৎসা পেতেন?

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দিনের অবরোধে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে মিডলাইন পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সিলেটে অবরোধের দ্বিতীয় দিন বিএনপি, ছাত্রদল ও জামায়াতের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পথচারীসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছে।
এইসব কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিন্তু নয়, বরং তা পরিকল্পিত এবং সাধারণ মানুষ হত্যা করার নীলনকশা। এই নীলনকশা বিএনপির আজকে নয়, ২০১৩ সালেও আমরা দেখেছি। বিএনপি সেইসময় যে পরিমাণ মানুষ পেট্রোল বোমা মেরে হত্যা করেছে তা ভয়াবহ মানবতা বহির্ভূত কর্মকাণ্ড।
পৃথিবীর সব মানবাধিকার সংগঠন বিবিধ বিষয়ে কথা বলে, কিন্তু বিএনপি ২০১৩ সালে যাদের হত্যা করেছে এবং ২০২৩ সালে তাদের সমাবেশে যে পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করেছে সেইসব বিষয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো ততটা উচ্চকিত নয়। কেন জানি তারাও নিষ্প্রভ।
‘আমার বাবা কবরে চলে গেছে, বাবা বলছিল আমার সোনা মনিকে খাওয়াইও আর দেইখ্যা রাইখো। আমাকে বাবা অনেক আদর করতো, বাবার অনেক কথা আমার মনে পড়ছে। আমাকে সোনা বলতো, পাখি বলতো, সোনামণি বলে ডাকতো, ডিউটি থেকে আসার সময় আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতো। অনেক কষ্ট হচ্ছে আমার। এখন আমাকে কেউ সোনাপাখি বলে ডাকবে না।’
কথাগুলো তানহার। ২৮ অক্টোবর ২০২৩ তারিখ বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম পারভেজের সাত বছর বয়সী মেয়ে তানহা আক্তার যেভাবে তার বাবার জন্য আকুতি জানায় তা এখনো কানে বাজে। এই হত্যার সংস্কৃতি কেউ কি চেয়েছে? হরতাল-অবরোধ আবারও অবরোধের মাধ্যমে আর কত তানহার আকুতি যে শুনতে হবে তা কে জানে? আমরা কেউই এই হত্যার রাজনীতি চাই না। আমরা না চাইলেও বিএনপি কী চাইছে সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








