আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো অনেকটাই অনুমেয় হলেও, এর পরিণতি কী হবে তা অনিশ্চিত।
বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সাতটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরছেন।
সীমিত হামলা ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
এই দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর অধীনস্থ বসিজ বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নির্দিষ্ট ও নিখুঁত হামলা চালাবে। এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কম থাকবে এবং দুর্বল হয়ে পড়া বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারে ইরান। তবে এটিকে সবচেয়ে আশার ও কম সম্ভাব্য দৃশ্যপট বলে মনে করা। ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, সামরিক হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ডেকে এনেছে।
সরকার টিকে থাকবে, নীতিতে নমনীয়তা আসবে
এটি দৃশ্যপট অনেকটা ভেনেজুয়েলা মডেলের মতো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী হামলার পরও ইসলামিক রিপাবলিক টিকে থাকবে, তবে তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইরান আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমাবে, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করবে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন কিছুটা শিথিল করতে পারে। কিন্তু ৪৭ বছরের কঠোর অবস্থানের কারণে এই সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকার পতন, সামরিক শাসনের উত্থান
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি। গণবিক্ষোভে সরকার দুর্বল হলেও নিরাপত্তা বাহিনী ও আইআরজিসির শক্ত অবস্থানের কারণে শাসন টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় বেসামরিক সরকার ভেঙে পড়ে ইরান সামরিক শাসনের অধীনে যেতে পারে, যেখানে আইআরজিসির শীর্ষ কর্মকর্তারাই ক্ষমতা দখল করবে।
মার্কিন ঘাঁটি ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা
ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যেকোনো মার্কিন হামলার জবাব দেওয়া হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি বিশেষ করে বাহরাইন, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উদাহরণ দেখিয়েছে, ইরানের সক্ষমতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
পারস্য উপসাগরে নৌপথে মাইন পাতা
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যেমনটি হয়েছিল, তেমনই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মাইন বসাতে পারে ইরান। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগবে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া
ইরানের আরেকটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে ‘সোয়াম অ্যাটাক’ একযোগে ড্রোন ও দ্রুতগামী নৌকা দিয়ে হামলা। এতে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবে যেতে পারে। এমন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সামরিক ও রাজনৈতিক অপমান হবে, যদিও এই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করা হয়।
সরকার পতনের পর চরম বিশৃঙ্খলা
সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা হলো, সরকার পতনের পর ইরান সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলায় ডুবে যেতে পারে। কুর্দি, বালুচসহ বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হতে পারে, তৈরি হতে পারে বড় ধরনের মানবিক ও শরণার্থী সংকট। প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইরানের অস্থিতিশীলতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইরানের সীমান্তে বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি মুখরক্ষার জন্য হামলার সিদ্ধান্ত নেন। সেক্ষেত্রে এমন একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার পরিণতি অনিশ্চিত এবং যার শেষ কোথায় তা কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।









