পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব দুর্গাপূজা। ওয়ারশ বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ পোল্যান্ড (WBAP)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই শারদীয় উৎসবে প্রবাসী বাঙালিরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একত্রিত হয়ে বাঙালীর ঐতিহ্য তুলে ধরেন।
পূজার মন্ত্রপাঠ, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজনে মুখরিত ছিল পূজা প্রাঙ্গণ। এবারের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় ওয়ারশের ‘এয়ারডান্স স্পেস ওয়ারশ’-তে। উৎসবের সূচনা হয় ২৬শে সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, ষষ্ঠী ও মহাসপ্তমীর পূজার মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় ২৮শে সেপ্টেম্বর, রবিবার, বিজয়া দশমী বিসর্জনের মাধ্যমে।
পূজার সময়সূচি ও বিস্তারিত:
২৬শে সেপ্টেম্বর (শুক্রবার): সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মহাসষ্ঠী এবং বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
২৭শে সেপ্টেম্বর (শনিবার): সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মহাঅষ্টমীর পূজা এবং এরপর সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
২৮শে সেপ্টেম্বর (রবিবার): সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিটি পূজাতেই পুষ্পাঞ্জলির ব্যবস্থা ছিল এবং বহু ভক্ত এতে অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসের মাটিতে শেকড়ের টানকে অটুট রাখতে এখন থেকে প্রতি বছর ওয়ারশ বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন এই দুর্গাপূজার আয়োজন করবে আর এই উৎসবকে ঘিরে কয়েক দিনব্যাপী চলে নানা অনুষ্ঠান।
পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে প্রবাসী বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে এবং পুরুষরা পাঞ্জাবি-পাজামায় সজ্জিত হয়ে পূজায় অংশ নেন, যা বিদেশের মাটিতে এক চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে প্রবাসী বাঙালি শিল্পী এবং তাদের সন্তানেরা অংশগ্রহণ করেন।
বাংলা ইংরেজি ও পোলিশ ভাষায় বিভিন্ন শিল্পীদের পরিবেশিত গান, এবং বিভিন্ন ধরনের নাচে পূজা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার একটি প্রয়াস ছিল বলে আয়োজকরা জানান।
দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাঙালি খাবারের আয়োজন। লুচি, আলুর দম এর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। এই ভোজের আয়োজন প্রবাসী বাঙালিদের পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং একে অপরের সাথে ভাব বিনিময়ের সুযোগ করে দেয়। ওয়ারশ বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ পোল্যান্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, “বিদেশে থেকে দেশের সবচেয়ে বড় উৎসবকে এভাবে পালন করতে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা এবং পোল্যান্ডে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে একটি ভাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করা।”
পূজায় আগত এক দর্শনার্থী বলেন, “কাজের সূত্রে দেশে থাকা হয় না। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন কলকাতার কোনো পূজা মণ্ডপেই আছি। এই কয়েকটা দিন আমরা সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে একসঙ্গে আনন্দ করি।” বিজয়া দশমীর দিনে বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। বিষাদের সুর থাকলেও, আগামী বছর আবার মায়ের আগমনের প্রতীক্ষায় প্রবাসী বাঙালিরা একে অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পোল্যান্ডে এই দুর্গাপূজার আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়ের মিলন ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক প্রতিচ্ছবি।












