ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক-ইউসিবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুশাসনের মধ্যে নিয়ে আসতে চান বলে মন্তব্য করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ।
চ্যানেল আইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন
চ্যানেল আই: বাংলাদেশের ব্যাংকি সেক্টরের সাথে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ব্যাংকিং সেক্টরের একটা বড় ধরণের চেঞ্জ হয়েছে। আপনার অভিজ্ঞতায় গত ১৫ বছরে শাসনামলে ব্যাংকিং খাত কেমন ছিল?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ: আমাদের ব্যাংকিং জগত মাঝখানে কিছুটা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা পার করেছি। কিছুটা বললে ভুল হবে। অনেকটা খারাপ সময় পার করেছি। আপনি বলেছেন দুঃশাসনের কথা, আমাদের ব্যাংকিংয়ে সুশাসনের বিষয়টা অনেক বেশি জরুরি।
আমরা যেটাকে বলি গভার্নেন্স। গুড গভার্নেন্স বা সুশাসন। এটা খুব জরুরি একটা বিষয়। গুড গভার্নেন্সটা শুরু হয় একেবারে ওপর থেকে। অর্থাৎ বোর্ড লেভেল থেকে এটার প্রথম যাত্রা। তারপর সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট। এবং এটা চলে আসবে শেষ পর্যন্ত। যখন আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাংকটাকে একটা সুশাসনের কালচারে নিয়ে আসতে পারবো, তখন ব্যাংকিং সুন্দরভাবে চলে এবং প্রতিটি ব্যাংক যদি একইভাবে চলে তাহলে পুরো ব্যাংকিং সিস্টেম ঠিকভাবে চলবে।
গত ১৫ বছর বিশেষ করে শেষের দিকে এসে আমাদের সুশাসনের অভাব হয়ে পরেছিল। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলেন, বা প্রভাবের কথা বলেন বা ব্যাংকের বোর্ড লেভেল থেকে প্রভাবের কথা বলেন, যেটা সঠিক প্রভাব না সেই ধরণের প্রভাবের কারণে ব্যাংক থেকে অনেক লোন হয়েছে, যে লোনগুলো হয়তো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অনেক লোন যে কারণে হয়তো এনপিএল বা নন পার্ফর্মিং লোনে পরিণত হয়েছে। এবং সেটার ব্যাংকে ফেরত আসার প্রক্রিয়াটা অনেক ক্ষেত্রে নেই হয়ে গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ধীর হয়ে গেছে। যেটুকু ব্যবসার কারণে গতিশীলতাটা কমে গেছে সেটা আমরা বুঝি। যেখানে ইচ্ছার অভাব ছিল না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ইচ্ছাবশত খেলাপী ঋণে পর্যবসিত হয়ে গেছে এবং সেই লোনগুলো সঠিকভাবে কাজ করে নাই। এই পুরো বিষয়ইটিই হচ্ছে সুশাসনের অভাব।

চ্যানেল আই: একটা সময় বলা হতো যে, আমাদের দেশ স্বাধীন হবার সময়ে তলাবিহীন ঝুড়ি। চোরের দেশ। কিন্তু আসলেই দেশটাকে লুটপাট করে তলাবিহীন ঝুড়ি বানিয়ে গেছে পালিয়ে যাওয়া সরকার। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরকে নিঃস্ব করে চলে গেছে। একজন ব্যাংকার হিসেবে টের পেয়েছেন সেটা?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ: প্রভাব তো আমরা দেখছিলাম। কেবলমাত্র আমরা যে দেখছিলাম, তা না। মাঝে মাঝে পত্র পত্রিকাতেও এসেছে। কিন্তু যেভাবে এটা আসতে পারতো সেভাবে আসতে পারে নাই। কিন্তু আসতে পারে নাই এই কারণে যে মিডিয়ারও কিন্তু স্বাধীনতার ঘাটতি ছিল। যখন মিডিয়াও ঠিক মতো কথা বলতে পারে না, তখন দেশবাসীর যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন, দেশবাসী সেটা জানতে পারে না।
এখন কিন্তু খবরের রাশ চলে এসেছে। অনেক খবর মনে হচ্ছে এক সঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু সব খবরের শুরুটা কি এখন? না! সব খবরের শুরুটা কিন্তু এখনকার না। কিছু খবর চলে এসেছে, পুরোনো খবর চলে এসেছে। সব লোন কী হঠাৎ করে এখন এসে এনপিএল হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে? তা না। এটা ওভার দ্য পিরিয়ড খারাপ হচ্ছিলো এবং সেই প্রভাবগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম ব্যাংকাররা। কারণ যখনই আমাদের ক্রেডিট ইভ্যালুয়েশন বা আন্ডার রাইটিংয়েংর যে প্রসেসটা তার মাধ্যমে কাজ না করে যখন তাকে প্রভাবিত করা হয়, সেটা রাজনৈতিক প্রভাব হোক অথবা বোর্ড লেভেল এর প্রভাব হোক, তখন কিন্তু ম্যনেজমেন্ট তাদের দক্ষতা দিয়ে যে কাজটা করা দরকার সেটা তারা করতে পারে না। সেটা আমরা বিভিন্নভাবে ফেস করছিলাম। বিভিন্ন ব্যাংকের থেকে কথাবার্তা আসছিলো। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে মিডিয়ার স্বাধীনতা বেড়েছে। যে কারণে অনেক কিছুই দেশবাসী জানতে পারছে, যা হয়তো আগে জানতে পারতো না।
চ্যানেল আই: আমি দেখেছি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর এবং ব্যাংকিং সার্ভিসটা গ্লোবাল সার্ভিস এখন। আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। এই দেশ একবার স্বাধীন হয়েছিলো, আবারও স্বাধীন হয়েছে। এই নতুন স্বাধীনতায় ব্যাংকিং সেক্টরে কীরকম স্বাধীনতা এসেছে?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ: ভালো কাজ করলে সেটার পুরস্কার পাওয়া যায়। অনেস্টি, ইনটিগ্রিটি নিয়ে কাজ করলে সেটার সেটার প্রতিদান পাওয়া যায়। এবং সেটারই একটা রিকগনিশন হচ্ছে আমাকে এই ব্যাংকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা, পরিবর্তনের পরে। যখন নতুন বোর্ড গঠিত হলো এবং নতুন বোর্ড গঠনের কয়েকদিন পরেই তারা আমার সাথে যোগাযোগ করলেন। চেয়ারম্যান সাহেব এবং অন্যান্য বোর্ড মেম্বার যারা আছেন আরা তাদের ইচ্ছার কথা জানালেন। তারা বললেন তারা ব্যাংকটাকে পুনর্গঠন করতে চান। সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতে আমি অংশগ্রহণ করতে পারি। সেই সুযোগটা আছে। তো এইটা আমি বলবো যে একটা রেকগনিশন।
নিষ্ঠার সাথে, সততার সাথে ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করতে পেরেছি বলেই একটা রিকগনিশন এখন হলো। আমাকে এইখানে নিয়ে আসা হলো। এর মধ্যে আমরা কিছু কাজ করেছি। যেটা আমাদের চেয়ারম্যান সাহেবও বলেছেন। আমরা একটা অডিট করছি। অনেক জিনিস অডিটের মাধ্যমে বের না করলেও আমরা অনেক কিছু মিডিয়ার মাধ্যমে জানছি। কথার মাধ্যমে জানছি। কিন্তু সেটার ওপর ভিত্তি করে তো আমরা একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকশন নিতে পারি না।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকশন নিতে হলে পরে এটা একটা অডিট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে। যে কাজটা আমরা করেছি তা হলো আমরা ৫ জন অডিটর নিয়োগ করেছি। আমাদের মোর দেন এইটটি পারসেন্ট লোন পোর্টফোলিও তারা অডিট করবে। এরপর যা হয়েছে, আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এবং আমাদের যারা রেগুলারেটর, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমরা সহযোগীতা পাচ্ছি। কারণ এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যা আমাদের ইন্টার্নাল বা এক্সটার্নাল অডিটর খুঁজে এনে বের করে দিতে পারবেন না। কারণ একবার আমাদের ব্যাংক থেকে ফান্ড বের হয়ে গেলে তাকে ট্রেস করতে হলে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স উইংসের হেল্প লাগে। যাতে আমরা অ্যাকাউন্ট গুলোকে আইডেন্টিফাই করতে পারি। কোথায় ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলোর আইডেন্টিফাই করতে পারি।
চ্যানেল আই: কতটুকু আপডেট হয়েছে?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ: আমাদের অডিট ফিফটি পার্সেন্টের মতো কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। উনাদেরকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময় দেয়া আছে। দেখি কত তাড়াতাড়ি এটা পেতে পারি। কিছু কিছু জায়গায় হয়তো আমরা আংশিকভাবে প্রতিবেদন নিতে পারি। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আমাদের কমপ্লিট ইনফরমেশন আসে তখন হয়তো আমরা সেটি আগেই নিয়ে নিতে পারি।
ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমাদের দু’ধরণের বিষয় লাগবে। একটা হচ্ছে, আমাদের দেশে নিয়ে থাকুক, তাদের তো দেশীয় সম্পদও আছে। আইডেন্টিফিকেশন করার পরে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা লাগবে ল’ইনফোর্সমেন্টর সহায়তা লাগবে।
চ্যানেল আই: তারা কী সহায়তা করবেন?
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ: তারা সহায়তা করছেন। আমাদের পক্ষ থেকে যখনই সহায়তা চাওয়া হচ্ছে উনাদের পক্ষ থেকে সেই সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। আপনারা জানেন বর্তমান সরকার বিদেশে যে অ্যাসেটগুলো আছে সেগুলো রিকভারি করার জন্যেও একটা টিম গঠন করেছে। এবং সেই টিমটার কাজ হবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারে সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যেয়ে কথা বলবে। এখানে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট আলোচনা দরকার।









