কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন দেশের শোবিজ অঙ্গনের বহু তারকা। পরে সরকার পতনের এক দফা দাবীতে রাস্তায় নামতেও দেখা যায় তারকাদের একটা বড় অংশকে। যাদের অগ্রভাগে ছিলেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মমর মত লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার খ্যাত অভিনয়শিল্পীরা!
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন ২০০৬ সালের লাক্স চ্যানেল আই প্রতিযোগিতার প্রথম রানার আপ জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। এমনকি শিক্ষার্থীদের হয়ে নেমেছেন রাজপথেও। কখনো ফার্মগেট, কখনো শাহবাগ আবার কখনোবা শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার সঙ্গে দেখা গেছে তাকে।
শুধু তাই নয়, সরকারের পদত্যাগের পর রাতে মহল্লায় মহল্লায় ডাকাত উৎপাত বেড়ে গেলে সেখানেও প্রতিরোধে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে তাকে। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্রূপের শিকারও হয়েছেন, এমনকি হত্যার হুমকি পর্যন্ত পেয়েছেন বলে দাবী করেন এই অভিনেত্রী।
বাঁধন বলেন, ‘আমি যেদিন থেকে ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনে মাঠে নামি, ওই দিন থেকেই আমাকে ফোনে, খুদে বার্তায়, ফেসবুকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছিলো। অ্যাসিডও মারতে চেয়েছে। আমি ভয় পাইনি। কারণ, একসঙ্গে আন্দোলনের দিনগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে-মুখে যে আগুন দেখেছি, আমি নিজেই তাদের কাছ থেকে সাহস সঞ্চয় করেছি। ‘বলতেও খুব খারাপ লাগে, সহশিল্পীদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে আমার কাজও হয়েছে, তারা ছাত্রদের পক্ষে মাঠে তো ছিলেনই না, উল্টো আমাকে ভয় দেখিয়েছেন, ব্যঙ্গবিদ্রূপ করেছেন। তাদের এমন কাজে কষ্ট পেয়েছিলাম। তবে তাদের প্রতি আমার এখন কোনো বিদ্বেষ নেই।”
আন্দোলনে সফল হয়ে এই সময়ে এসে বাঁধন মনে করেন,“প্রতিহিংসা মানুষ, দেশকে পিছিয়ে দেয়। আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পেরেছি। ছাত্রদের এই আন্দোলনে মিশে যাওয়ার বিষয়টি অসাধারণ জার্নি ছিল। যে জার্নির কথা আমি পুরো জীবনে ভুলব না। আমাদের সবার কষ্ট সফল হয়েছে। যদিও এখন কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। কখনই এগুলোর সমর্থন করি না। সবাইকে অনুরোধ করব, সবাই একটা সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলে, সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলে, আমরা আমাদের বিদ্বেষের রাজনীতি বন্ধ করব। একটা নারীবান্ধব গণতান্ত্রিক বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ব।”
২০০৬ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার বিজয়ী জাকিয়া বারী মম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন যোদ্ধা হিসেবে প্রতিবাদে শামিল ছিলেন। এমনকি অভিনয় শিল্পী সংঘের কার্যনির্বাহি কমিটির মেম্বার পদ থেকেও ৪ আগস্ট তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। নাটকের অভিনয় শিল্পীদের সংগঠন ‘অভিনয় শিল্পী সংঘ’ ছাত্রদের আন্দোলনে নীরব অবস্থানে থাকায় এ সংঘ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন মম।
শিক্ষার্থীদের বিজয়ে তাদের ‘লাল সালাম’ দিয়ে মম বলেন, ছাত্ররা সাহসের সঙ্গে সামনে ছিল, আমরা সবাই তাদের পিছনে ছিলাম। তাদের কারণে আমরা বিজয় পেয়েছি। কিন্তু যারা আন্দোলনে শহীদ হয়েছে তারা এই বিজয় দেখে যেতে পারলেন না। তবুও তারা সবসময় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধায় থাকবেন। এখন আমরা দুর্নীতিমুক্ত, বাক স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা, চলচ্চিত্র থেকে শিল্প ক্ষেত্রে যারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান সবার স্বাধীনতা বজায় থাকুক। এমনকি আমরা চাইবো গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে। আর আমরা কোনো স্থাপনার ক্ষতি চাই না। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় প্রশাসনের ভাইদের কর্মক্ষেত্রে এসে দায়িত্ব পালন শুরু করুক এটাই চাই।
২০০৯ সালে লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মুকুটজয়ী মেহজাবীন চৌধুরী গেল মাস থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন যুগিয়েছিলেন। ১৮ জুলাইয়ের আগে পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালানোকে নির্মম, নৃশংস আখ্যা দিয়েছিলেন মেহজাবীন। বলেছিলেন, “ইতিহাস সাক্ষী; শক্তি যত বড়ই হোক, ছাত্রসমাজের ওপর চড়াও হয়ে যুগে যুগে কেউ কখনো কিছুই অর্জন করতে পারেনি। দমিয়ে না রেখে তাদের যৌক্তিক দাবিতে সমর্থন দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের দিনে রাস্তায়ও নেমেছিলেন মেহজাবীন। সেদিন সাধারণ জনতার সঙ্গে তিনিও বিজয় উল্লাসে মেতেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ছবিও পোস্ট করেছিলেন এ সময়ে নাটক ও ওটিটি মাধ্যমে সবচেয়ে চাহিদা সম্পন্ন এই অভিনেত্রী। পরে দেশে লুটপাট শুরু করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে মেহজাবীন জানান, দেশের অনেক জায়গায় কিছু মানুষ লুটপাট ও আগুন দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। পরবর্তীতে ‘উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরে ডাকাতের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে জনসাধারণকে সচেতন করে পোস্ট দেন।
২০০৯ সালের লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় রানার-আপ নাজিয়া হক অর্ষা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে গুলি করা নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। বরাবরই তিনি কথা বলেছেন দেশের মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে। রাস্তায় নেমে প্রতিটি সভা সমাবেশেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায় তাকে।
দুঃশাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর অর্ষা বলেন, কোনো হত্যাই আমাদের কাম্য নয়। কারণ, প্রতিটি মানুষেরই বাঁচার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া কখনওই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে হ্যাঁ, এটাও আবার মানতে হবে পৃথিবীর সব ধরনের স্বাধীনতার গল্পে এমন কিছু থাকে। যেখানে মানুষ লুটপাট করবে, জীবন যাবে। এর মধ্য থেকে যেহেতু আমরা নতুনভাবে আবারও স্বাধীন হয়েছি, সেহেতু এটি অবশ্যই ভালো দিক। এখন ধরে রাখাই হচ্ছে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিজের চাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, আমি সবসময়ই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। সে ক্ষেত্রে আমি একজন শিল্পী হিসেবে চাই, সিনেমার ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ড না থাকুক। একটা টিম থাকতে পারে, যারা সিনেমার প্রচার, পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কাজ করবে। সিনেমা আসলে স্বাধীন হওয়া উচিত। আমাদের দেশের সিনেমা রাজনীতি নিয়ে কথা বলবে, দুর্নীতি নিয়ে কথা বলবে, দেশের অগ্রগতি নিয়ে, কালচার নিয়ে কথা বলবে। আমি এটাই চাই। কারণ সিনেমার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করব এটাই স্বাভাবিক।
হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর তারকা অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম তার ফেসবুকে লিখেন,“ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের প্রতি স্যালুট। নতুন বাংলাদেশ তোমাদের ভুলবে না।” এরআগে ১৮ জুলাই ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছিলেন, “অবসান হোক চলমান সহিংসতার, দেশ পরিপূর্ণ থাকুক শান্তিতে সমৃদ্ধিতে এই কামনা আমাদের সকলের।”
ছাত্র আন্দোলনে শুরুতে রক্তারক্তি শুরু হলে লাক্স তারকা মৌসুমী হামিদও প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি বভিন্ন সময় ফেসবুকে পোস্ট করে প্রতিবাদ জানান। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ফেসবুক প্রোফাইল লাল করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন প্রতিবাদী পোস্ট।
সরকার পতনের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের ফেসবুকে সরব ছিলেন নাজিফা তুষি। শুরুতে তিনি শিক্ষার্থীদের ডাকা সরকার পতনের এক দফা দাবীর একটি রঙিন পোস্টার নিজের ফেসবুকের কাভার ফটোতে দিয়েছিলেন। এরপর শিক্ষার্থীদের পক্ষে পোস্ট ফেসবুকে শেয়ার করে একাত্মতা জানিয়েছিলেন।
ইচ্ছে থাকলেও বছরে দেড়েকের সন্তান রেখে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে থাকতে পারেননি অভিনেত্রী প্রসুন আজাদ। তবে ফেসবুকে ছিলেন বেশ সরব। প্রতিদিনই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন। সরকার পতনের দুদিন আগেও তিনি একটি পোস্টে ছাত্রদের উদ্দেশে লিখেছেন, “আমাদের জেনারেশন সত্যিকার অর্থে আপনাদের মতন কিছু করতে পারে নাই। আপনাদের এই ভয়েজ রেইজের জন্য বাংলাদেশীরা আজীবন মনে রাখবে.. সেভাবেই এগিয়ে যান।”
গেল মাসের মাঝামাঝিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে অভিনেত্রী শানারৈ দেবী শানু লিখেছিলেন,“আর কত মায়ের বুক খালি হবে? এমন রক্তাক্ত বাংলা চায় না কেউই!” তারআগে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখেছিলেন, “বিষাদের জনপদে রক্তাক্ত অনুভূতির ছুটি ঘোষণা!” সরকার পতনের দিনে অভিনেত্রী লিখেন,“বাংলার মানুষ এবার একটু শান্তি চায়… আর কোন হিংস্র রাজনীতির শিকার না হোক কেউ।”









