যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট (স্থায়ী বসবাসভিত্তিক) ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, যে পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে পেমেন্ট, কাগজপত্র এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্তির পর ভিসার জন্য অপেক্ষায় ছিল, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত এক ভয়াবহ ধাক্কা।
ওয়াহিদুল শিমুল, যিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, এই সিদ্ধান্তকে তিনি একটি বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার পরিবারে পুনর্মিলনের আশা নষ্ট হতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য বৈষম্যমূলক ও হতাশাজনক।
বিকল্প গন্তব্য
এই পরিস্থিতির ফলে অনেক বাংলাদেশি কর্মী এবং ব্যবসায়ী এখন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঝুঁকবেন। অন্য দেশগুলো তাদের শ্রমশক্তি গ্রহণ করে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে এই দেশের অর্থনীতি উপকৃত হতে পারে। তবে, এটারও একটা নেতিবাচক দিক রয়েছে; যে অভিবাসনপথে দেশগুলো এগিয়ে যাবে, সেখানকার মান এবং সুযোগ আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চমানের নাও হতে পারে।
রেমিট্যান্সে প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন এবং কাজ করছেন, যা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষভাবে সহায়ক। তবে, এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন অভিবাসী সংখ্যা কমে গেলে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধীর হতে পারে। এক অর্থে, দেশীয় অর্থনীতির জন্য এটি একটি বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

সব প্রভাবই নেতিবাচক নয়
লেখক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিষয়টি দেখছেন স্বাভাবিক ভাবেই। তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি খারাপ খবর হলেও যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তের পিছনে কোন আন্তদেশীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে বলে মনে করছেন না তিনি।
মানসিক চাপ এবং অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী রিনি তাহমিনা নাসরিন এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সবারই নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। অন্যদের অবস্থান থেকে সেটা পরিষ্কার বোঝা যায় না। বর্তমান প্রশাসনের কিছু নীতি স্পষ্ট। তারা অবৈধ অভিবাসী এবং তাদের মার্কিন সুযোগ সুবিধা ভোগ বন্ধ করতে চাচ্ছে। সব কার্যক্রমেরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। দেখা যাক। যদিও সবাই বলছে, পোর্ট এন্ট্রি রেকর্ড যাদের আছে, তাদের ভয়ের কিছু নেই, তারপরও আমি ভীত এবং দ্বিধান্বিত।
দেশের জন্য আশীর্বাদ
বিষয়টি অনেকটা আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তার মতে, যারা সামর্থ্যবান আছেন তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আর ফেরত আসতে চান না। কোন একটা সময় দেশের সম্পত্তি বেচে টাকাটা সেখানে নিয়ে যায়। এর ফলে সেখানে (যুক্তরাষ্ট্র) টাকা পাচারের পরিমাণটা কমবে।
এই বিষয়ে চিন্তা না করার পরামর্শও দেন তিনি। তার মতে, নীতি নির্ধারকদের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এর ফলে দুই পাসপোর্ট থাকার যে রীতি তাও কমে আসবে। ফলে এমন পদক্ষেপ আমাদের জন্য উপকারও বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

ব্যবসা ও প্রস্তুতিতে প্রভাব
ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত আইনি সহায়তা, ভিসা প্রসেসিং, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিস্থিতিতে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান এই কাজের মাধ্যমে তাদের আয় নির্বাহ করে, কিন্তু যদি আবেদনকারীরা আগ্রহ হারান, তাহলে তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আবেদনকারীদের আগ্রহ কমে যেতে পারে
শেষ কথা
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিতাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করছে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যাবে। বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক হলেও, ভবিষ্যতের নীতি পরিবর্তন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে যেহেতু এটি সাময়িক এবং নন–ইমিগ্র্যান্ট ভিসা চালু রয়েছে, তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ নয়। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের দিকেই এখন নজর থাকবে।









