সাবেক মিস আর্থ বাংলাদেশ ও সমাজকর্মী মেঘনা আলম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত এসসা ইউসুফ আল দুহাইলান-এর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেঘনা দাবি করেন, আল দুহাইলান প্রথমে তাকে আকৃষ্ট করেন সৌজন্য ও ধর্মীয় উপহার দিয়ে। যারমধ্যে ছিলো কোরআন, নামাজের চাদর, জায়নামাজ, এরপর ফুল, গয়না এমনকি “সৌদি বাদশাহর পক্ষ থেকে উপহার” লেখা ২০০ কেজি খেজুরও তাকে পাঠান দুহাইলান।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রথম তাদের দেখা হয়। এরপর দ্রুতই সম্পর্ক গাঢ় হয় বলে জানান মেঘনা। “আমি স্বীকার করছি একজন প্রভাবশালী মানুষ আমাকে পছন্দ করছিলেন, বিষয়টা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। তখন মনে হয়েছিল তিনি খুব আন্তরিক মানুষ। এখন বুঝি, সবকিছু অনেক তাড়াহুড়ো করে ঘটছিল।”
মেঘনা জানান, দুহাইলান তাকে বলেছিলেন তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে । এমনকি একটি হীরার আংটিও উপহার দেন। তবে পরে জানান- সৌদি কূটনীতিকরা বাংলাদেশি নাগরিকদের বিয়ে করতে পারেন না, সে কারণে তাদের সম্পর্ক ‘আইনি বৈধতা পাবে না’।
এর মধ্যেই তাদের বিয়ে ও গর্ভধারণ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানগুলো তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে, অভিযোগ করেন মেঘনা।
“মানুষ সরাসরি বলত ‘আমরা এমন একজনকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর রাখতে পারি না, যিনি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছেন বা গর্ভপাত করেছেন’। অথচ এসবই মিথ্যা।”
এরপর ‘দুহাইলানের স্ত্রী’ পরিচয়ে মেঘনার কাছে একদিন ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাকে “বাঙাল প্রেমিকা” বলে অপমান করা হয়। এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ মেঘনা বেশিরভাগ উপহার ফেরত দেন। শুধু কোরআন, জায়নামাজ ও কয়েকটি ধর্মীয় জিনিস রেখে দেন।
তিনি দুহাইলানকে বলেন, “গুজব বন্ধ করে সত্য প্রকাশ করুন, না হলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করব।”
এর পরদিনই ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল, মেঘনার ঢাকার বাসায় হঠাৎ কয়েকজন সাদা পোশাকের ব্যক্তি হাজির হন। তারা দাবি করেন, তার জন্মসনদ ও মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন।
ভীত মেঘনা ঘটনাটি ফেসবুক লাইভে প্রচার করেন। এরপর তাকে আটক করে গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। মেঘনা দাবি করেন, সেখানে দুই দিন তাকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ, ফোন ও ল্যাপটপ কেড়ে নেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক ভিডিও মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মেঘনা বলেন,“এটা ছিল মানসিক নির্যাতন, আমাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা।” পরে তাকে ‘স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর আওতায় আটক দেখানো হয়।
১০ এপ্রিল মধ্যরাতে আদালত তাকে ৩০ দিনের রিমান্ডে পাঠায়, পরদিন পুলিশ দাবি করে- তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিপন্ন করেছেন। অভিযুক্তের দাবি,‘পুরো বিষয়টাই সাজানো’। মেঘনা বলেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল শুধু সৌদি দূতকে বাঁচানোর জন্য।
“সরকারের লোকেরা বলেছিল, রাষ্ট্রদূতকে ক্ষুব্ধ করলে সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক নষ্ট হবে” বলেন তিনি। তার অভিযোগ, দুহাইলান সেদিনই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান, ফোন নম্বর বন্ধ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেন।
গ্রেপ্তারের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানায়। তারা বলেছে,“স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট ব্যবহার করে মডেল মেঘনা আলমকে আটক করা হয়েছে— যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন।”
একই সঙ্গে ২৭ জন নারী অধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিল্পী ও শিক্ষাবিদ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস-কে চিঠি লিখে মেঘনার মুক্তির দাবি জানান। পরে ২৮ এপ্রিল তাকে জামিন দেয় আদালত।

এখন মেঘনা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন। তিনি বলছেন, সামাজিক অপমান ও মানসিক নির্যাতনে তিনি ভেঙে পড়েছেন। “আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে, যেন আমি পুরো সমাজের লজ্জার কারণ” বলেন মেঘনা। অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন,“আমাকে পতিতা বলা হচ্ছে, বিদেশি এজেন্ট বলা হচ্ছে। অথচ আমি জানি, আইনি লড়াইয়ে কোনো ন্যায় বিচার পাব না, কারণ পুরো সিস্টেম তাকে (দুহাইলাইন) রক্ষা করছে।”
আদালতে হাজিরার সময় তিনি দুহাইলানের দেওয়া কোরআন ও নামাজের চাদর সঙ্গে রাখেন- প্রমাণ হিসেবে যে তাদের সম্পর্ক ধর্ম বা মূল্যবোধবিরোধী ছিল না। তিনি বলেন, “পাঁচ মাস হয়ে গেছে। আমি ইতিবাচক থাকতে চাই, কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলে দোষারোপ করা হচ্ছে,” বলেন মেঘনা। “এইভাবে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।” সূত্র: The Independent (UK)









