ইসলাম ধর্মকে অবমাননা ও আল্লাহর নামে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেফতারকৃত মানিকগঞ্জের বাউল শিল্পী আবুল হোসেন সরকারের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) ওই বিবৃতিতে বলা হয়, মানিকগঞ্জের বাউল শিল্পী আবুল হোসেন সরকারকে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় পুলিশ, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করেছেন, আল্লাহর নামে কটুক্তি করেছেন।
স্থানীয় এক ইমামের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ নভেম্বর রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার মুক্তির দাবিতে বাউল-ফকিরদের সমাবেশে হামলা করেছে তথাকথিত ’তৌহিদী জনতা’। মানিকগঞ্জে স্লোগান উঠেছে ‘একটা একটা বাউল ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।’ আমরা এই দুই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে আবুল সরকারের মুক্তির দাবি করছি।
বিবৃতিতে বলা হয়, শত শত বছর ধরে গ্রামবাংলায় প্রচলিত কবিগান ও পালাগানের যে ঐতিহ্য, তারই এক ধারা হলো বিচার গান। এই ধারার গানে দু’জন স্বভাবকবি/শিল্পী দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে যুক্তিতর্ক হাজির করেন। কথা ও গান দুই উপায়ে একপক্ষ অপরকে তর্কে হারানোর চেষ্টা করেন। সেদিন জীব ও পরম – এই দুই পক্ষে লড়াই করছিলেন আবুল সরকার, প্রতিপক্ষের নামও ছিল আবুল সরকার (যিনি ফরিদপুর থেকে এসেছিলেন)। আলোচ্য আবুল সরকার মহারাজ ছিলেন জীবের পক্ষে, পরমকে ছদ্ম আক্রমণই ছিল তার লড়াইয়ের লক্ষ্য। সেদিন দুই কবির দার্শনিক বাহাস চলে চার ঘণ্টা ধরে। সেই চার ঘণ্টা থেকে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কেটে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে কটূক্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। পরে মামলা করা হয়েছে, দ্রুত গ্রেফতারও করা হয়েছে।
বিবৃতিতেহ আরও বলা হয়, শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবিগুলো হলো-আবুল সরকারকে বিনাশর্তে, অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। যে সূত্র থেকে পরিপ্রেক্ষিতবিহীনভাবে ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে, বিচারের আওতায় আনতে হবে।
আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে যে সমাবেশ, সেখানে যারা হামলা করেছে, তাদের সংবাদের/ভিডিওর ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করতে হবে ও গ্রেফতার করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে কট্টরবাদী ও দঙ্গলবাজদের অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আব্দার রক্ষা করার চর্চা বাদ দিতে হবে, বরং সকল নাগরিকের জন্য সমান আচরণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে, প্রচলিত আইন ধরে সরকারের আচরণ নির্ধারিত হতে হবে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার আমলের শেষের দিকে টাঙ্গাইলের বাউল রীতা দেওয়ানের বিরুদ্ধে একই ছকে একাধিক মামলা করা হয় ও গ্রেফতার করা হয়। আমরা মনে করি, বাউল-ফকিরদের ওপরে কট্টরবাদীদের এরকম বিদ্বেষ ও হামলা নতুন নয়। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সময়ে অতি ডানপন্থীদের আস্ফালন যেমন বেড়েছে, তেমনি সরকারের দিক থেকে আস্কারাও তারা পেয়েছে। আগে বাউলের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করলে সেখানে অন্তত হামলা হতো না। এবারে হলো। ৫ আগস্টের পরে শত শত মাজার ভাঙা হয়েছে, গানের আসর পণ্ড করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের বহু ম্যুরাল এবং ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে, পথেঘাটে নারীদের অপমান-অপদস্ত করা হয়েছে, এমনকি ‘ইসলামবিরোধী’ চিহ্নিত করে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই দঙ্গল-প্রবণতা সমাজের সর্বস্তরে দেখা যাচ্ছে, তার কিছুটা অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনুমিত বাস্তবতা ধরা গেলেও, বেশিরভাগটাই সরকারের নীরবতা বা প্রশ্রয়ের কারণে হচ্ছে। দঙ্গলসন্ত্রাস সমালোচনার বিপরীতে সরকারি দায়িত্ববান ব্যক্তি বলেছেন, তাদের মব না বলে প্রেশার গ্রুপ বলতে হবে এবং সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা আবুল সরকারের গ্রেফতার প্রসঙ্গে হতাশাজনক ভূমিকা রেখেছেন।
বাউল-ফকিররা তৃণমূলে তাদের গান ও দার্শনিক কথনের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করেন। কট্টরবাদের বিকাশকে যুক্তিতর্ক দিয়ে শান্ত করেন, যেটা আধুনিক ও সেকুলার ভাবধারার শিক্ষিতজনেরও করার সামর্থ্য নাই। বিশেষত গ্রামে ও তৃণমূলে উদারপন্থা প্রচারের সামর্থ্য যতটা ফকির-বয়াতিদের আছে, ততটা হয়তো নাগরিক উচ্চশিক্ষিতের নেই। ফলে ফকির-বাউলদের কেবল ফোক বা আবহমান বাংলার সংস্কৃতির প্রতিভূ না ধরে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকাকে শনাক্ত করতে পারতে হবে। ওদিকে কট্টরপন্থী সালাফি-ওয়াহাবী থেকে জামাতি কারোরই বাউল-ফকিরদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক তর্ক বা বাহাস মোকাবেলা করার সামর্থ্য নেই। তাই তারা কটূক্তির নামে মামলা করে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে বাউল-ফকিরদের গ্রেফতারে বাধ্য করে।
একদিকে যুক্তি-তর্ক, অন্যদিকে রয়েছে উত্তেজনা ও ধর্মীয় আরোপন – দ্বিতীয় দলের মতো করেই সবাইকে ধর্মচর্চা করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে তারা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করবে, সহিংস হবে, মামলা-হামলা করবে। প্রথম দলকে অবশ্য কখনো সহিংস ও উত্তেজিত হতে দেখা যায় না, বরং মরমী সাধক হিসেবেই তাদের সমাজে দেখা যায়। বরং তাদের পূর্বসূরী দরবেশ-ফকিরদের উদার ও মরমী ব্যাখ্যার কারণেই একসময় পূর্বভারতে দলে দলে লোকে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
সরকার ও রাষ্ট্রীয় আইনকানুনকে চলতে হয় এসব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে। মামলা হলেই গ্রেফতার হয় না, প্রাথমিক একটা বিচারের সুযোগ থাকেই, যে গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ হয়েছে কিনা। ক্ষণিকের ও খণ্ডিত ভিডিও যারা এডিট করে বিশেষ উদ্দেশ্যে ছড়িয়েছে, তারাও অপরাধ করেছে কিনা, তা বিচারের সুযোগ আছে। আবার কারো মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করা নাগরিক অধিকার। সেই সমাবেশে হামলা বরং গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগই এই অন্যায় গ্রেফতারের প্রতিবাদ করেনি। তাদের এই নিরবতাও প্রশ্নযুক্ত।









