সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার মাহমুদুল হাসান কর্তৃক নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ‘মুরতাদ কাফির’-আখ্যা দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতি এ দাবি জানায় সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ‘মুরতাদ কাফির’ আখ্যা দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান। একজন শিক্ষক এরকম দায়িত্বহীন মন্তব্য করতে পারেন এটা অবিশ্বাস্য। গত ৯ ডিসেম্বর তারিখে রোকেয়া দিবসে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘আজ মুরতাদ কাফির বেগম রোকেয়ার জন্মদিন।’
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ইতিহাস বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০—৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) ছিলেন সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক এবং নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। রোকেয়া যে সামাজিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন, সেখানে মেয়েদের গৃহের অর্গলমুক্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল না। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শিক্ষালাভ করেন। তিনি সমাজ সংস্কার ও নারী শিক্ষার বিস্তারে ব্রতী হয়েছিলেন। ২০ শতকের প্রথমদিকে বাঙালি মুসলমানদের নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণে তিনিই প্রধানত নেতৃত্ব দেন। ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, বিজ্ঞান, কল্পকাহিনী ও শ্লেষাত্মক রচনায় রোকেয়ার স্টাইল ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তিনি নারী-পুরুষের সমকক্ষতার যুক্তি দিয়ে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার অভাবকে নারীর পশ্চাৎপদতার কারণ বলেছেন। নারী শিক্ষার বিস্তারে ১৯০৯ সালে তিনি ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ স্থাপন করেন। পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে এটির যাত্রা শুরু হলেও দ্রুতই এর ছাত্রী সংখ্যা একশত পেরিয়ে যায়। এছাড়া ১৯১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা মুসলিম মহিলা সমিতি। ফলে সাহিত্য চর্চা, সংগঠন পরিচালনা ও শিক্ষাবিস্তার এই ত্রিমাত্রিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সমাজ সংস্কারে এগিয়ে আসেন এবং স্থাপন করেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রোকেয়া বাংলা তথা তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের নারীশিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি লড়েছেন অন্ধ কুসংস্কার, বৈষম্য ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে। তিনি ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন না, বরং সমাজে ও দেশে এবং বিশেষত নারী সমাজের প্রতি ধর্মের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার মাহমুদুল যেভাবে তাঁকে ‘কাফির মুরতাদ’ আখ্যা দিয়েছেন, তা ঘোরতর অন্যায় ও অসম্মানজনক। একইসঙ্গে সমগ্র শিক্ষক সমাজের জন্য তা গ্লানিকর। এ ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য বর্তমানে বাঙালি মুসলমান নারীসহ সকল নারীর পথচলাকে ঝঁকিপূর্ণ করে তোলে। রোকেয়ার জন্মদিবসে তাকে হেয় করার চেষ্টা তার বিশাল অবদানকে ছোট করতে পারে না, তিনি দিনে দিনে আরও উজ্জ্বল হবেন। উল্টো এ ধরনের ব্যক্তি চরম সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক হিসেবে ধিকৃত হবেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এটা পরিহাসের বিষয় যে, একদিকে রোকেয়ার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এই ব্যক্তির এরকম বক্তব্য সমাজে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বাড়াতে এবং নারীর প্রতি অনলাইনে ও বাস্তবে চলমান সহিংসতা আরও বাড়িয়ে তুলতে মদদ যোগায়, যাকে-তাকে যখন-তখন ‘নাস্তিক’ বা ‘মুরতাদ’ বলে ‘হত্যাযোগ্য’ করে তোলার পথ প্রশস্ত করে। ফলে এ বক্তব্যকে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ বলা যায় না, বরং ‘হেইটস্পিস’ হিসেবেই গণ্য করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্ক এহেন প্রতিক্রিয়াশীল মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে এরকম ঘৃণা ও উস্কানিমূলক বাক্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।









