মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দিন দিন আরও গভীরতর হচ্ছে। আর্জান্ততিক সহায়তা সংস্থাগুলি সতর্ক করে জানিয়েছে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটি একটি “পূর্ণ মানবিক বিপর্যয়ের” মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) দুর্ভিক্ষ এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত তহবিল সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএফপি রাখাইনে দ্রুত বেড়ে চলা বাস্তুচ্যুত জনগণের জন্য খাদ্য সহায়তার চেষ্টা চালাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর থেকে ক্যাম্পে বাস করা প্রায় ১,৪০,০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ মিয়ানমারের বেশিরভাগ অঞ্চলের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। তবে, সামরিক অবরোধের কারণে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক।
গত ২০ এপ্রিল ‘ওহন তাও কি’ ক্যাম্পে বসবাসকারী ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিজের খাবারে এবং স্ত্রী ও দুই সন্তানের খাবারে কীটনাশক মিশিয়ে দেন। তিনি নিজে মারা যান, তবে প্রতিবেশীদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে বাকিদের জীবন রক্ষা পায়।
গত জুন মাসে সিত্তেতে বসবাসকারী ৫ সদস্যের একটি রাখাইন পরিবার একইভাবে মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা গেছে।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তাদের বৈশ্বিক তহবিল ২০২৪ সালের তুলনায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে তারা মিয়ানমারে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা পরিবারের মাত্র ২০ শতাংশকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারছে।
ডব্লিউএফপি’র মিয়ানমার প্রতিনিধি মাইকেল ডানফোর্ড বলেন, ‘মানুষ এক দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকা পড়েছে। সংঘাতে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, জীবিকা থেকে বঞ্চিত, এবং মানবিক নিরাপত্তা জালের বাইরে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ক্ষুধার জ্বালায় শিশুদের কান্না এবং মায়েদের খাবার না খাওয়ার হৃদয়বিদারক গল্প শুনতে পাচ্ছি। পরিবারগুলি তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা একা এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পারবে না।’
রাখাইন ইতিমধ্যেই ২০১২ সালের সহিংসতা ও ২০১৭ সালের গণহত্যা এবং রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়নের ফলে বিপর্যস্ত ছিল। সর্বশেষ, ২০২৩ সালে জান্তা সরকার বিদ্রোহী আরাকান সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সব ধরনের বাণিজ্য ও পরিবহন পথ বন্ধ করে দেয়।
ফলে সিত্তে এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং কেবল সমুদ্র ও আকাশপথে সেখানে যাতায়াত সম্ভব।
এর ফলে, তহবিল থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর জন্য আরাকান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত বেশিরভাগ এলাকায় প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ক্যাম্পে থাকা এক বাসিন্দা বলেন, মানুষ ঘরের বাইরে যেতে পারছে না, কাজ নেই, জিনিসপত্রের দাম পাঁচগুণ বেড়েছে, আয় না থাকায় অনেকেই শুধু সিদ্ধ তারো শিকড় খেয়ে বেঁচে আছে।
এদিকে আরাকান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিয়ানমার জান্তার পক্ষে জনবল সংগ্রহে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা পুরুষকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা কাউকে পাঠাতে পারেনি, তাদের অর্থ প্রদান করতে বলা হয়েছে।
ডব্লিউএফপি জানায়, রাখাইনের সব সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পরিবারগুলো ঋণ বৃদ্ধি, ভিক্ষাবৃত্তি, পারিবারিক সহিংসতা, স্কুল ঝরে পড়া, সামাজিক উত্তেজনা এবং এমনকি মানব পাচারের মতো চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সংস্থাটি জানায়, তাদের তহবিলের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতার দায় অনেক দাতা দেশের। তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ইউএসএআইডির ৮৭% তহবিল হ্রাস করা নিশ্চিতভাবেই ডব্লিউএফপির এর সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএফপিতে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেয়, যা বিশ্বব্যাপী সরকার থেকে প্রাপ্ত মোট অনুদানের প্রায় অর্ধেক।
তবে, গত নভেম্বরে জাতিসংঘ রাখাইনে “দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা” বলে কঠোর সতর্কতা জারি করেছিল।
কিন্তু আজ, নয় মাস পরেও, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি তাদের তহবিলের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় পুনরায় আবেদন জানাতে হচ্ছে—এটি আন্তর্জাতিক সহায়তা খাতে ক্রমবর্ধমান অসংবেদনশীল পরিবেশেরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।









