গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা তদারকির লক্ষ্যে তথাকথিত ‘শান্তি বোর্ড’ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত এই বোর্ডে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে নির্বাহী সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) আল জাজিরার এক প্রতিবেদেনে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে এই বোর্ড। ব্লেয়ার ও কুশনার ছাড়াও বোর্ডে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সভাপতি অজয় বাঙ্গা এবং মার্কিন উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।
হোয়াইট হাউস জানায়, বোর্ডের সদস্যরা গাজার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত তদারকি করবেন। এর মধ্যে রয়েছে শাসন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার, পুনর্গঠন কার্যক্রম, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৃহৎ আকারের তহবিল সংগ্রহ।
এদিকে, গাজার জন্য উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে বুলগেরিয়ান কূটনীতিক ও জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলে ম্লাদেনভকে। একই সঙ্গে গাজার শাসন ও জনসেবা পরিচালনার লক্ষ্যে একটি ‘গাজা নির্বাহী বোর্ড’ গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
এই নির্বাহী বোর্ডে ব্লেয়ার, কুশনার ও উইটকফ ছাড়াও রয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের কূটনীতিক আলী আল থাওয়াদি এবং আরও কয়েকজন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি।
হোয়াইট হাউস আরও জানায়, গাজার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে মার্কিন মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্সকে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা অভিযান, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রমে এই বাহিনী নেতৃত্ব দেবে বলে জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন বলছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি থেকে ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হওয়া। তবে হামাস জানিয়েছে, অস্ত্র সমর্পণের আগে তারা নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক গ্যারান্টি চায়।
হামাস আরও জানায়, ট্রাম্প পরিকল্পনার আওতায় তারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, হামাসের পরিবর্তে আলী শাথের নেতৃত্বে ‘গাজার প্রশাসনের জন্য একটি জাতীয় কমিটি’ (এনসিএজি) দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে। আলী শাথ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপ-পরিবহনমন্ত্রী।
তবে শান্তি বোর্ড ও নির্বাহী বোর্ড গঠনের ঘোষণায় হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এ ঘোষণাটি আসে এমন এক সময়ে, যখন গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এক ১০ বছর বয়সী মেয়ে, ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর এবং এক বৃদ্ধ নারী নিহত হন। একই সময়ে কায়রোতে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসে প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটি।
এদিকে শান্তি বোর্ডে টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থাকা ব্লেয়ার ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরাক যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, জ্যারেড কুশনারও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অতীতে তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কুশনারের পরিবারের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্ত চলছে।
আল জাজিরার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি মাইক হান্না জানিয়েছেন, ট্রাম্প ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী শান্তি বোর্ড মূল নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে, আর গাজার নির্বাহী বোর্ড পরিবর্তনকালীন বাস্তব পরিস্থিতি সামলাবে। নিকোলে ম্লাদেনভের নিয়োগে জাতিসংঘের একটি ভূমিকা থাকছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।









