আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ॥ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে–
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি ॥কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে–
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ॥
গানের শুরুতে ইনিয়ে বিনিয়ে কোন কথা নয়, বলে দেওয়া হয়েছে ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’ আর এই ভালোবাসাটা একেবারে সোনার বাংলাকে। যেভাবে দরদ দিয়ে বলা হয় ‘সোনা বাপ আমার /সোনা মা আমার’ সেভাবেই আমার এই বাংলাকে সোনার বাংলা বলে তার প্রতি ভালোবাসার কথাটি বলা হয়েছে। এরপর এই বাংলার আকাশ বাতাস আলো কীভাবে আমার ভেতর প্রাণের স্পন্দন জাগায়, কীভাবে চিন্তার বিকাশ ঘটায়, কীভাবে আমার ভাবনাকে নাড়া দেয় সেই কথাটিই প্রাণে বাঁশি বাজানোর কথাটির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
পরের অংশে উঠে এসেছে দেশের প্রকৃতির মুগ্ধতা। এখানে প্রথমেই দেশকে মা বলে ডাকা হয়েছে। মাতৃভূমি মানে মায়ের ভূমি বা মায়ের দেশ নয়। মাতৃভূমি মানে মায়ের সমান বা মায়ের মতো যে দেশ। মায়ের কোলে থেকে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে শিশু বাঁচে আর মায়ের কোল ছেড়ে গেলে দেশ মায়ের বুক চিঁড়ে ফসল ফলিয়ে খেয়ে বাঁচে। দেশের মাটি থেকেই উঠে আসে খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছু। এই দেশ মাকে পরম মমতায় কবি ‘ও মা’ বলে মধুর সম্বোধন করে বলছেন কীভাবে এর প্রকৃতি আমাদের প্রশান্তি এনে দেয় ফাগুনের আমের মুকুলের মাতাল করা গন্ধ তো শুধুই প্রতীকী। এর ভেতর দিয়ে ফুল-ফলের এই গ্রামীণ বাংলার রূপ উঠে এসেছে। এখানে প্রশান্তির যে জায়গা, সুখের যে জায়গা, পেট পুরে খাবারের যে জায়গা এবং আমাদের ঐশ্বর্য মাঠ ভরা ধানের কথা কবি টেনে এনেছেন। বলেছেন মাঠ ভরা ফসল আমাদের জাতির মুখে কীভাবে হাসি ফোটায়।
এরপরের অংশ আমার ঠিকানা এই মায়ের মতো দেশের শীতল সুনিবিড় গাছের ছায়ায় যে প্রশান্তি তার কথা টেনে কবি হৃদয়ের গভীর থেকে একটু নিচু স্থানের সুরে শ্রোতাকে কল্পনার দেশ-মায়ের বুকে নিয়ে চলে গেছেন। গাছের ছায়া, নদীমাতৃক এই বাংলার নদীকূল, অপরূপ সুন্দরের এই বাংলার কোল যেন আমার ঠিকানা। এই সুন্দরের কোলে আমার চিরকালীন আবাস। জাতীয় সংগীতের এই অংশে মনে হয় একেবারে স্নিগ্ধতা মাখা প্রাণের ভূমিতে আমি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছি।
সংগীতটির শেষ অংশে বাঙালির আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যায়। যে মধুর ভাষার অধিকারের জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছি ৫২ তে, যে ভাষায় মা ডাকবো বলে আমরা রাস্তায় নেমে রক্ত দিয়েছি সে ভাষার মধুরতা দিয়ে শুরু হয়েছে শেষ অংশ। বাংলাদেশের বাণী এই বাংলা ভাষা কানে যে মধুর অনুভূতি দেয়, হৃদয়ে কম্পন তোলে ভালোবাসার সেই ভাষার কথা বলেছেন কবি এখানে। এর পরের লাইনে সমগ্র দেশ উঠে এসেছে। ‘মা তোর বদন খানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ‘ এই কথাটুকুতে দেশকে পরম মমতায় দ্বিতীয় বার ‘ও মা’ বলে ডাকা হয়েছে। আমরা মাকে মা, ও মা বলে কত আবেগেই না ডাকি। সেই আবেগে বলা হয়েছে দেশের শংকটে আমাদের দুঃখবোধের কথা। দেশের রূপ মলিন হলে আমাদের চোখ ভিজে আসে আমাদের অন্তর দুঃখে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সেই তীব্র ব্যথা ঘোচানোর জন্য আমরা মরিয়া হয়ে উঠি। এই পাগল করা ব্যথা ঘোচানোর জন্যই আমরা প্রাণ দিতে পারি অনায়াসে। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম দেশ মায়ের মলিনতা ঘুচাতেই। আমার প্রাণের শান্তি যেখানে, যে দেশ আমার মায়ের মতো তার উপরে কারোর কালো ছায়া আমি পরতে দেব না বলেই আমরা শপথ করি স্বদেশের মঙ্গলের।
হাজার হাজার বছর ধরে এই বাংলার মাটি, প্রকৃতি মন্থন করে যে সুরের জন্ম, যে সুর ঘুরে বেড়ায় একতারার তারে বাংলার আকাশে বাতাসে সেই সুরে এই অসামান্য কথার মালায় এমন মধুর গানের তুলনা গানটি নিজেই। পৃথিবীর কোন দেশেই এমন মধুর জাতীয় সংগীত নেই। প্রায় সব দেশের জাতীয় সংগীতের মূল ভাব প্রায় একই। একধরনের জাতীয়তাবাদী চেতনায় বা উগ্রতার ছাপ নিয়েই বেশিরভাগ দেশের জাতীয় সংগীত রচিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় সংগীতে নেই উষ্কানি বা উদগ্রতার লেশ, আছে পরম মমতায় দেশের রূপ বর্ণনা আর সেইসাথে শংকটে দেশের জন্য জেগে ওঠার প্রেরণা। দেশপ্রেমের এমন গান বিরল।
জাতীয় সংগীত হওয়ার পথ:
গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) লিখেছিলেন বৃটিশদের বিরুদ্ধে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। বাংলার মানুষকে জাগানোর জন্য বাংলার বাউলের সুর এই গানে ব্যবহার করেছেন তিনি। গগণ চন্দ্রের কণ্ঠে কবি প্রায়ই বাউলের সুর শুনতেন। তেমনি একটি গান ‘আমি কোথায় পাবো তারে’। এই গানগুলোর সুর তাঁর হৃদয়ে মিশে গিয়েছিলো। সেই সুরের রেখা বাংলাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে এসে মিশে গেছে। বলে রাখা দরকার- আমাদের সংস্কৃতির ধারায় হাজার বছরের মাটির সুর সকল সংগীতকারের সৃষ্টিতেই মিশেছে। যাঁদের শেকড় এই বাংলার মাটিতে তাঁরা এই মাটির গানকে এড়িয়ে যেতে পারেননি আর তাই এই সুর চিরকালীন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার পরও ওই গান তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। বাঙালি শংকটে, সংগ্রামে, সুখে-দুঃখে এই গান গেয়ে উঠেছে। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর বাঙালি তাদের সংস্কৃতি এবং অধিকারের জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানভুক্ত হয়ে শিকার হয় বৈষম্যের। তখন প্রয়োজন পড়ে বাঙালির একটি স্বাধীন দেশের। এই দেশের স্বপ্ন দেখার পেছনে যে গানগুলো শক্তি দেয় তার মধ্যে প্রধান জায়গায় চলে আসে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। ধীরে ধীরে আমরা যখন স্বাধীনতার দিকে, একটা স্বাধীন দেশ পাওয়ার পথে এগোতে থাকি তখন এ গান আর বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে থাকে না এবং বলতে দ্বিধা নেই যে রবীন্দ্রসংগীত হিসেবেও থাকে না। এই গান হয়ে ওঠে লাখো বাঙালির প্রাণের গান, দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা। ২৫ লাইনের রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম ১০ লাইন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি থেকে কিছু কিছু জায়গায় সরে গিয়ে এই গান আর রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে না থেকে জাতীয় সংগীতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাঙালির আবেগকে মর্যাদা দিয়ে জাতীয় সংগীত হিসেবে এই দশ লাইন গান একটি নির্দিষ্ট নির্দেশনায় গাওয়ার বৈধতা বিশ্বভারতীও দেয়। পঞ্চাশের দশকে বিভিন্ন সমাবেশ এবং সংগ্রামে এই গান গাওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় গানটি বিভিন্ন সমাবেশ, জনসভা ইত্যাদি কার্যক্রমে গাওয়া হয়। পাকিস্তান রবীন্দ্রনাথকে পূর্ববংগে নিষিদ্ধ করার পরও তখন পাকিস্তান বিরোধী বাংলার মানুষ এই গান গেয়ে পথে নামে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় গানটি গাওয়া হয়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আগেও গানটি গাওয়া হয়েছিল। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্যারেডেও গানটি গাওয়া হয়। মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার এই গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পরিবেশিত হত। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন হলে এর ৪.১ অনুচ্ছেদে ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ চরণ (মোট চরণ ২৫ চরণ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
‘আমার সোনার বাংলা’ একদিনে বা একটি সিদ্ধান্তে জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠেনি। গানটি রচনার প্রায় ৬৬ বছর পর গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়। বাঙালির অন্যতম প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানটি বাংলা ভাষাভাষী বা বাঙালির নিজস্ব ভূমির অধিকার পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে গানটি জাতীয় সংগীত হওয়ার আগে জাতি এই গানটি ৬৬ বছর চর্চায় রাখে। দীর্ঘ সময়ে লাখো কোটি মানুষের মনে জায়গা করে নেয় গানটি দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। আর সেই শক্তিতেই গানটি বাঙালির দেশ এই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়।
লেখক: মো.মামুনুল ইসলাম অধ্যক্ষ, শিশুতীর্থ আনন্দধ্বনি সংগীত বিদ্যায়তন ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









