অবাধে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে কেবলই ঝুঁকিতে পড়ছে তা নতুন করে বলা অনাবশ্যক। তামাক নানান ধরণের রোগ তৈরির অন্যতম কারিগর। ক্যান্সার, হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগসহ এরকম অনেক রোগই তামাকের কারণে হয়ে থাকে। মুখের ক্যান্সার তৈরিতে তো তামাকের জুরি মেলা ভার।
বিশেষজ্ঞদের মতে মুখ ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে তামাকের রয়েছে নিবিড় সম্পৃক্ততা। আবার পরিবেশ বিপর্যয়েও তামাকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। তামাকের উৎপাদন ও ব্যবহার জনমানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ভীষণ বিঘ্নিত করছে।
এবছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের শ্লোগান ছিল ‘গ্রো ফুড, নট টোব্যাকো’। অর্থাৎ ‘তামাক নয়, খাদ্য ফলান’। বলা হচ্ছে, যখন জীবনের প্রয়োজনে দরকার খাদ্য, তখন কোনোভাবেই আমরা অধিক লাভের আশায় তামাক চাষকে উৎসাহিত করতে পারি না। তামাক চাষের কারণে জমি নষ্ট হোক, পরিবেশ নষ্ট হোক এটা হতে পারে না। তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা, তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনা, পাবলিক প্লেসে কেউ যাতে অবাধে ধূমপান করতে না পারে, সেই বিষয় নজরদারিতে আনা নিয়ে কারো মতান্তর নেই।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-কানুনগুলো আরও শক্তিশালী না হওয়ার কারণে কিছু ফাঁকফোকর থেকেই যাচ্ছে। সেই ফাঁকফোকরগুলো ঠিক না করতে পারলে তামাকের ব্যবহার কতোটা কমবে, কতোটা নিয়ন্ত্রণে আসবে তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
আড়ালে-আবডালে তামাকের যত্রতত্র ব্যবহার সর্বত্র। পাবলিক বাসে আগের তুলনায় যাত্রীরা ধূমপান কম করলেও সব বাসেই ড্রাইভারকে দেখা যায় গাড়ি চালান অবস্থায় ধূমপান করতে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাতে এই দৃশ্য সবসময় চোখে পড়ে। বিষয়টি চরম বিরক্তকর হলেও কারও কিছু করার থাকে না। বরং যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে বিপদে পড়তে হয়। রাজধানীতে অনেক রিকশা চালক আছেন যারা রিকশা চালানো অবস্থায় ধূমপান করে থাকেন। আবার স্কুল-কলেজ টাইমে দেখা যায় ইউনিফর্ম পড়ে শিক্ষার্থীরা ধূমপান করছেন। আর চায়ের স্টল, হাট-বাজারগুলোতে ধূমপান করার ক্ষেত্রে কেউ কোনো ধরণের সতর্কতা ও নিয়ম অনুসরণ করেন না। এসব কারণে যে বা যারা ধূমপান করনে না, তাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
তামাক ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ঐ ঘোষণায় তামাক পণ্যে উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ এবং কর কাঠামো ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি বিদ্যমান আইনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল’ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার নির্দেশনা ছিলো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং জনস্বার্থের প্রতি সময়োচিত সংবেদনশীলতা দেখিয়ে “ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ যা ২০১৩ সালে প্রথম সংশোধিত হয়েছিলো, সেটিতে অধিকতর সংশোধনীর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। খসড়া সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা গেলে আমাদের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি প্রকৃত পক্ষেই আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত হবে।
সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি শক্তিশালীকরণের মূল লক্ষ্য- যারা তামাক ব্যবহার করেন না সেই নাগরিকদের তামাকের প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়া। পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের নাগরিকদের তামাক ব্যবহারের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এটি বিশেষ সহায়ক হবে। যেমন, সংশোধনীর প্রস্তাবনা অনুসারে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা বা ডেজিগনেটেড স্মোকিং এরিয়া বাতিল করা হলে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারকারিদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্যের প্রদর্শনী বন্ধের বিধান রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ধূমপানের প্রবণতা ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব। অন্য দিকে বিড়ি/সিগারেটের খুচড়া শলাকা বিক্রি বন্ধের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা যদি অনুসরণ করা হয় তবে কমবয়সী এবং নিম্ন আয়শ্রেণীর মানুষের এসব তামাক পণ্য ব্যবহারের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যাবে।
এগুলো ছাড়াও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তামাক কোম্পানির সিএসআর নিষিদ্ধ, ই-সিগারেটকে অবৈধ ঘোষণা করা, এবং তামাক পণ্যের গায়ে সচিত্র সতর্কবার্তার আকার বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব যেমন কমবে, অন্যদিকে তেমনি নতুন নতুন তামাক পণ্য ও তার প্রচারণার মাধ্যমে যুুব সমাজকে আকৃষ্ট করার সুযোগও সীমিত হয়ে আসবে। ই-সিগারেট সিগারেটের মতো দেখতে না হলেও সিগারেটের বিকল্প হিসেবেই ই-সিগারেটের আবির্ভাব। ফ্যাশনেবল হওয়ায় ব্যাটারিচালিত এই যন্ত্রটিতে প্রায়ই টান দিতে দেখা যায় বর্তমান তরুণদের।
লিথিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে কার্টিজে থাকা নিকোটিন, স্বাদ ও গন্ধমিশ্রিত ই-লিকুইড ও প্রপিলিন নামক রাসায়নিক পুড়িয়ে মস্তিকে ধূমপানের মতো অনুভূতির সৃষ্টি করে ই-সিগারেট। গত কয়েক বছর ধরেই তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেটের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি খসড়াটিতে সময়োপযোগী প্রস্তাবগুলোর কারণে ইতোমধ্যে সর্বস্তরের জনগণ এবং নীতি-নির্ধারকদের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ১৫৫ জন সংসদ সদস্য ইতিমধ্যেই জনপরিসরে এই খসড়া সংশোধনীটি দ্রুত চুড়ান্তকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মনে রাখতে হবে তামাকজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বড় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন আরও অনেকে। তাই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের প্রক্রিয়াটি যতো দ্রুত চূড়ান্ত করা যায় ততোই মঙ্গল।
এই প্রেক্ষাপটে একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদকালেই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ করা একান্ত জরুরী। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করা হলে পাবলিক প্লেসে ধূমপান আরও কমে আসবে। জনসচেতনতাও বাড়বে। মানুষের দায়বদ্ধতাও বাড়বে। তামাক মুক্ত সমাজ গড়ার পথেও আমরা এগিয়ে যাব। প্রধানমন্ত্রীর তামাক মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও উন্মুক্ত হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








