আমেরিকার ঘোষিত ভিসা নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা না করেই স্যাংশন প্রদানের বিষয়টি আমেরিকার কাছে নতুন নয়। আমেরিকার দূতাবাস বলছে, ভিসা নীতি কাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে সে বিষয়ে তাদের পলিসি অনুযায়ী মুখ খুলতে নারাজ। তবে বাংলাদেশে গুজবের কারণে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জনের নাম দেখা যাচ্ছে। যদিও আমেরিকা এখনো কারও নাম প্রকাশ করেনি।
সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে পিটার হাস বলেছেন, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশের সাংবাদিক নেতারা। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, সরকারি দল, বিরোধীদল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর আগামীতে গণমাধ্যমও ভিসা নীতিতে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার জানান, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ব্যাপারে ডোনাল্ড লু বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলেছি, এই নীতির আওতায় ভিসা নিষেধাজ্ঞা যাদের দেওয়া হবে, তাদের নাম আমরা প্রকাশ করব না। কাউকে ভিসা না দেওয়াসহ যে কোন ভিসা রেকর্ড মার্কিন আইন অনুযায়ী গোপনীয় তথ্য। আমি এটুকু বলতে পারি, এই নীতি ঘোষণা করার পর থেকে সার্বিক ঘটনা খুব কাছ থেকে আমরা দেখেছি। সাক্ষ্য-প্রমাণ ভালোভাবে পর্যালোচনা করার পর আমরা বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি।
গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে বক্তব্য আসার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সোরগোল সৃষ্টি হয়েছে। জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে সবাই যেখানে সোচ্চার ঠিক সেই জায়গায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দূরভিসন্ধিমূলক মনে হয়েছে। একটি দেশের স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আমেরিকা আদতে কি বক্তব্য দিতে চায়? স্বাভাবিকভাবেই কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আইনানুগ বক্তব্য প্রদানের সুযোগ কারও নেই। সে জায়গায় আমেরিকা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে লক্ষ্য করে নির্বাচনের ঢামাডোলের মধ্যে স্যাংশন আরোপের মধ্য দিয়ে প্রকৃতঅর্থে কী বোঝাতে চায়? এ ব্যাপারটি কিন্তু খুবই লক্ষণীয়।
ইতিপূর্বে আমেরিকা যাদের ওপর স্যাংশন আরোপ করেছে, সেখানে যদি লক্ষ্য রাখা হয় তাহলে দেখা যাবে আমেরিকার স্বার্থ কোনভাবে ক্ষুণ্ণ হলে স্বার্থের খাতিরেই কতিপয় দেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন দিয়ে নিজেদের স্বার্থকে আদায় করার চেষ্টা করে থাকে। পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রটিকে চাপের মধ্যে রেখে অবৈধ সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা থেকে এমনটি হয়ে থাকে।
লিবিয়া, ইরাক ও দক্ষিণ আমেরিকার বিরুদ্ধে আমেরিকার স্যাংশনের চিত্রকে যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে প্রত্যেক জায়গায় আমেরিকার স্যাংশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই ছিল। নিজেদের স্বার্থে তারা যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে পিছপা হয় না। শুধু তাই নয়, কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক ইস্যুতে আমেরিকার বিরোধ তৈরি হলে সেই রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে পর্যন্ত কথা বলতে দ্বিধা করে না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য নজির রয়েছে যেখানে দেখা যায় কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে আমেরিকার কোন কিছুতে দ্বিমত হলে তাদের সঙ্গে একটি অলিখিত বিরোধে জড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রটি। ফলশ্রুতিতে ভুক্তভোগী হয় অনেকেই এবং একটি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, গণমাধ্যমের ওপর স্যাংশন আরোপ করবে মর্মে বিবৃতি প্রদান করে আমেরিকা তাদের রাষ্ট্রটির প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের রাজত্ব কায়েম করা। এমন একটি পৃথিবী তৈরি করা যেখানে দেখা যাবে সবাই আমেরিকাকে কোন না কোনভাবে তোয়াক্কা করে রাষ্ট্রটিকে সুযোগ সুবিধা প্রদান করবে। আমেরিকা তাদের ইচ্ছেমত পৃথিবীর অন্যান্য দেশে নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারবে। অর্থাৎ সব সময় মোড়লগিরির ধান্দা থেকেই আমেরিকা মূলত তাদের রাজনীতি পরিচালনা করে থাকে। দেখা যায়, তাদের সরকার পরিবর্তিত হয়, সরকার প্রধান পরিবর্তিত হয় কিন্তু তাদের নীতির কোন পরিবর্তন হয় না।
সম্মানিত পাঠক আপনারাই বলুন কোন দেশ যদি প্রকৃতঅর্থে মানবাধিকারের চর্চা করে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে উক্ত দেশটি কি কোনভাবে অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে সমালোচনা করতে পারে। আমেরিকা মূলত ইতিপূর্বে যা বলেছে সে বিষয়ে জনগণ পরিস্কার ধারণা পাবে যদি জনগণ আমেরিকার রাষ্ট্রদূত কর্তৃক বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর স্যাংশন দেওয়া হবে বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করে।
আমেরিকা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে বলেছে, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ব্যাপারে কথা বলেছে। কিন্তু তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে ভিন্ন ছিল সেটি প্রমাণিত হয় গণমাধ্যমের ওপর স্যাংশন প্রদানের ব্যাপারে অবগত করার মাধ্যমে। সুতরাং আমেরিকার এই হুমকি ধুমকিতে তেমন ভয় পাবার কিছুই নেই কেননা তাদের উদ্দেশ্য ষড়যন্ত্রমূলক
আমেরিকার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে যেকোন ভাবে তাদের রাজত্ব কায়েম করা। এই জায়গায় যারা সহযোগিতা করা থেকে পিছপা হটে আমেরিকা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে, স্যাংশন প্রদান করে থাকে ইত্যাদি। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় আমেরিকা সবসময়ই বাংলাদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েই আমেরিকা এ ধরণের কার্যক্রমের দিকে ধাবিত হচ্ছে মর্মে অনেকেই মনে করেন।
কাজেই আমেরিকার বাকস্বাধীনতা হরণের হুমকিকে সাধারণভাবে না নিয়ে জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সজাগ করে তুলতে হবে। কেননা দেখা যায়, এ সকল বিষয়ে সঠিকভাবে না জেনে বুঝে জনগণ বিভ্রান্তিতে পড়ে এবং একটি সংকটকাল অতিক্রম করে। শুধু শুধু জনগণকে ক্রান্তিকাল অতিক্রান্ত করবার পরিবেশ তৈরি না করে স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে গণমাধ্যমে সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে হবে। কেননা গুজব সৃষ্টিকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে গুজব তৈরিতে তৎপর, তারা সুযোগ পেলেই সাধারণ জনতাকে বিভ্রান্ত করতে উৎসুক হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে দেশপ্রেমিক জনতাকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর যারা স্যাংশন প্রদান করতে চায়, আর যাই হোক তারা কোন মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী হতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে এমন বিষয় চাউর আছে যে, আমেরিকা যেখানে নিজেদের দাপট দেখাতে ব্যর্থ হয় সেই দেশটির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। আবার এও দেখা যাচ্ছে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরিবেশের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে দেশটির ব্যবসায়ীরা। সুতরাং বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বুঝবার নিমিত্তে কূটনৈতিক বিষয়াদির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। তবে আমেরিকা গণমাধ্যমের ওপর স্যাংশন দিবে মর্মে যে বিবৃতি দিয়েছে তা মূলত স্বাধীন সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করারও শামিল। কাজেই এ ব্যাপারগুলোর যাচাই বাছাই সাপেক্ষে বাংলাদেশের জনগণের আমেরিকার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








