রমজানে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় সবসময় ওপরের সারিতে থাকে খেজুর। প্রতিবছরই রমজানের আগে খেজুরের বাজারের অস্থিতিশীলতা থাকে আলোচনায়। সেই পরিস্থিতির লাগাম টানতে এবার আগে ভাগেই খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয় সরকার। তাতে করে মান ভেদে প্রতিকেজি খেজুরের শুল্ক কমেছে ৫৪ টাকা পর্যন্ত। তারপরেও বাজারে খেজুরের দাম আমদানি মূল্যের প্রায় তিনগুণ।
কিন্তু শুল্ক ছাড়ের পর কোন খেজুর দেশের বাজারে ঢোকেনি এমন অজুহাতে বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রোজার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ খেজুর কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের পড়তে হচ্ছে বিপাকে, কপালে পড়ছে ভাঁজ। আগে যেসব ক্রেতা পাঁচ কেজি খেজুর কিনতেন তারা এখন কিনছেন ১ থেকে ২ কেজি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের আমদানি তথ্য বলছে: ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে খেজুর আমদানি হয়েছে এক কোটি ৭৯ হাজার ৯৩০ কেজি। এসব খেজুরের আমদানিমূল্য দেখানো হয় ২২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আমদানিমূল্যের বিপরীতে ব্যবসায়ীরা শুল্ককর পরিশোধ করেছেন ১০২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আমদানিমূল্য ও শুল্ককর মিলে ৩২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার সঙ্গে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ যোগ করে প্রতি কেজি খেজুরের গড় দাম পড়ে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা।
কিন্তু সেই খেজুর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে মান ভেদে ৮০০, ১১০০, ১৪০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। সাত ধরনের খেজুরের দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখন গড়ে প্রতি কেজি খেজুরের দাম পড়ছে ৯৭৫ টাকা। কিন্তু কাস্টমসের প্রদর্শিত আমদানিমূল্য ও শুল্ক এবং পরিবহন-শ্রমিক খরচ যোগ করে প্রতি কেজি খেজুরের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৩৫০ টাকা। বাড়তি নিচ্ছেন প্রতি কেজিতে ৬২৫ টাকা।
এক্ষেত্রে বিক্রেতারা বাড়তি মুনাফা করছেন বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। খেজুরের বাজারের এমন নৈরাজ্য ঠেকাতে বাজার মনিটরিং জোরদারের আহ্বান তাদের।
গতবছর রমজানে খেজুরের পাইকারী মূল্য ছিলো: আজোয়া ১ কেজি ১১০০ টাকা, আজোয়া ৩ কেজি ২৮০০ টাকা, আজোয়া AD ৫ কেজি ৩২০০ টাকা, আজোয়া বাটি ৪ কেজি ৪৮০০ টাকা, মাবরুম ১ কেজি ১২০০ টাকা, মাবরুম ৩ কেজি ৩২০০ টাকা, মাবরুম ৫ কেজি ৫২০০ টাকা, মাবরুম (সৌদি) ৫০০০ টাকা, কালমি ৩ কেজি ২০০০ টাকা, কালমি ৫ কেজি ৩৭০০ টাকা, সুক্কারী ৩ কেজি ১৬০০ টাকা, সুগাই ৩ কেজি ১৮০০ টাকা, সুগাই ৫ কেজি ২২০০ টাকা, আম্বার ৩ কেজি ২৬০০ টাকা, রাবেয়া ৫ কেজি ২০০০ টাকা, মজদুল ৫ কেজি ৩০০০ টাকা, তিউনিশিয়া বাটি ৬ কেজি ২২০০ টাকা, মবরুম VIP ৫ কেজি ৫২০০ টাকা, মরিয়ম ৫ কেজি ৪০০০ টাকা, মরিয়ম ১ কেজি ৭০০ টাকা, মেডজুল ১ কেজি ৮৫০ টাকা, আম্বার ১ কেজি ৫৭৫ টাকা।
এবছর সেই তুলনায় কার্টুন প্রতি খেজুরের দাম বেড়েছে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম কমেছে।

এমন পরিস্থিতি ক্রেতাদের কণ্ঠে হতাশা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রমজানকে সামনে রেখে পরিবারের জন্য খেজুর কিনতে এসেছেন একটি বেসরকরি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আরিফ চৌধুরী। রমজানের বাজারে খেজুরের দাম কেমন দেখছেন?
এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন: তিন-চার মাস আগে যে খেজুরটার দাম ছিলো ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এখন সেটা চাওয়া হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজি। এমন যদি হয় তাহলে খেজুর কিনবো কী করে! এবার রোজায় হয় খেজুর খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে, না হলে যেখানে পাঁচ কেজি খেজুর লাগতো এখন সেখানে এক-দুই কেজি দিয়ে কাজ চালাতে হবে।
দাম একটু কম পাওয়ার আশায় খেজুরের ৫ কেজির কার্টুন কিনতে কারওয়ান বাজারে এসেছেন আজাদ বিশ্বাস। কিন্তু দাম শুনে হতাশ হতে হয়েছে তাকেও। তিউনিশিয়ান ফিট খেজুর আগে ১০০০-১২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন সেটা ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি হলে খেজুর কিনবেন কিভাবে, সে প্রশ্নে খুঁজছেন তিনি। তিনি বলছেন, সরকার অন্তত রোজার এ সময়টাতে বাজারটা ঠিকঠাক মতো মনিটরিং করতো তাহলে অন্তত খেজুরের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছাতো না।
ভোক্তা পর্যায় থেকে দাবি করা হচ্ছে, কোন কোন ক্ষেত্রে খেজুরের দাম গত বছর এমনকি ৬ মাস আগের বাজার থেকেও ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি দাবি করা হচ্ছে বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে। এমন পরিস্থিতিতে আশা তাদের, রমজান মাস শুরু হলে কিছুটা কমবে খেজুরের দাম।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর সবচেয়ে বড় আমদানি ফলের পাইকারী বাজার বাদামতলীর ফল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ. মজিদ এন্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী এমডি. ইউসুফ খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ফলের বাজার বর্তমানে অস্থিতিশীল। অনেক ব্যাংক এলসি খুলছে না, যার কারণে আমরা অনেক ভোগান্তিতে পড়েছি। ব্যাংক থেকে ব্যাংকে দৌড়েও আমরা সময় মতো এলসি করতে পারিনি। তারপর সরকার যখন রমজানের বাজার সহনশীল করার জন্য এলসির অনুমতি দিলো তখন আমরা ব্যাংকে গিয়ে যেখানে দশটা এলসি করতে পারতাম, সেখানে একটা এলসি করতে পেরেছি।







