একমাসের ব্যবধানে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম হয়েছে দ্বিগুণ। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, বাজারে এখন দেশি ও আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দর ৬০ থেকে ৭০ টাকা, যা এক মাস আগেও ছিল ৩০ থেকে ৪৫ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে বাজার ফিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ক্রেতারা। অন্যদিকে ‘পানির দামে বিক্রি’ করে আক্ষেপ উৎপাদনকারী কৃষকদের মাঝে।
কৃষিমন্ত্রণালয় বলছে: বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় এতোদিন পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছিলো। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে শিগগিরই পেঁয়াজ আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসেছেন এলিটা জাহান। তিনি বলেন: ঈদের আগে পেঁয়াজের দাম এত চড়া ছিল না। মঙ্গলবার বাজারে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে অর্ধেক কিনতে হয়েছে। রমজানের শুরুর আগে ৩০ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছি। আজ কিনলাম ৭০ টাকায়।
‘পর্যাপ্ত’ উৎপাদনের পরও পেঁয়াজের দাম বাড়ছেই:
আড়াই বছর আগে প্রকাশিত ‘প্রমোটিং অ্যাগ্রিফুড সেক্টর ট্রান্সফরমেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়: বাংলাদেশে কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে পেঁয়াজের বাজারেই অস্থিতিশীলতা দেখা যায় সবচেয়ে বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন: দেশে পেঁয়াজের যে আবাদ হয়েছে তাতে চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণে প্রতিদিন পণ্যটির দাম বাড়ছে। দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তা দিয়ে দেশের চাহিদে পূরণ হওয়ার নয়, এরপর আবার আমদানিও বন্ধ। এসব কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।
কিন্তু কৃষিমন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে: চলতি বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারলেও ৩৫ লাখ টনের কাছাকাছি উৎপন্ন হয়েছে। আর দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন।
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেছেন: পেঁয়াজের দামটা বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এত বাড়ার কারণ নাই। লাভেরও তো একটা সীমা থাকবে। এখন কৃষকরা পাচ্ছে না, কোন লেভেলে বাড়ছে, দুই-চার দিনের মধ্যেই আমরা জানাবো।

কৃষক কতোটুকু লাভবান হচ্ছেন:
ফরিদপুরের কৃষক আমীর মোল্লা চলতি বছর ২ একর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করে পেয়েছিলেন ১২০ মনের মতো। তিনি তার আক্ষেপের কথা জানিয়ে বলেছেন: যখন পেঁয়াজ ঘরে তুলেছি তখন পেঁয়াজ বিক্রি করছি ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মণ। আমাদের তো রাখার জায়গা নেই। বাড়িতে রাখলে পেঁয়াজ পচে যায়। তাই ‘পানির দামে’ বিক্রি করতে হয়েছে, পেঁয়াজের আবাদ করলাম, কিন্তু দাম পেলাম না।
নওগাঁর আরেক কৃষক ইদ্রিস মালিথা জানান: গতবার কৃষি অফিস থাকে সার-বীজ দিয়েছিলো, আমি পেঁয়াজ আবাদ করেছিলাম। পেঁয়াজ তোলার পর বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাই এবার আর পেঁয়াজের আবাদ করি নাই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান: যেকোন কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আমরা জানি যে, হারভেস্টের পরে যখন সাপ্লাই বেড়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম কমা শুরু হয়। কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পণ্যের আবার দাম বাড়তে থাকে।
তিনি আরও বলেন: পেঁয়াজ যে সময় হারভেস্ট করা হয় সেই সময়টা পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনটার কথা বলা হয়। কিন্তু পেঁয়াজ এমন একটাপণ্য, যেটা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওজন হারায়। ওজন হারানোর ফলে যেটা হয়, যে লক্ষ্যমাত্রা, যে হিসাবটা দেয়া হয় সেটা থাকে না।
দেশে কেউ কী পেঁয়াজ মজুদ করে রেখে দাম বাড়িয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা বলছেন: ঢাকা শহরের কোন ব্যবসায়ীর পেঁয়াজ মজুদ করার সুযোগ নেই। এই পেঁয়াজ মজুদ করতে অনেক জায়গার প্রয়োজন হয়। তবে মফস্বল শহরগুলোতে কিছু কিছু ব্যবসায়ী পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য চাঁঙ্কি বানিয়ে সংরক্ষণ করতে পারে। তাদের কিছু পেঁয়াজ মজুদ করার সম্ভাবনা থাকে।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার যে কারণ বলছেন ব্যবসায়ীরা:
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের খান অ্যান্ড সন্স বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী গৌতম বাবুর কাছে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন: বাইরের কোন পেঁয়াজ নাই। দেশে যে পেঁয়াজ হয়েছে সেটা প্রচুর পরিমাণে হয়নি। এবার ফলনও কম হয়েছে। ফলন বেশি হলে দাম এমন থাকতো না। ৩৫-৪০ টাকার মধ্যে উঠানামা করতো।
কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে রেকর্ড পেঁয়াজ উৎপাদনের তথ্যের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন: দেশের পেঁয়াজের ভরসায় থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে কেজি ১০০ টাকায় উঠবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে: দেশে গত তিন বছরে পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৬-২৭ লাখ টন। প্রতিবছর সংরক্ষণের অভাবে বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ৩০-৩৫ শতাংশ পেঁয়াজ শুকিয়ে বা পচে নষ্ট হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে পণ্যটি উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ছিল ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টন। যদিও বা গত অর্থবছরের চেয়ে ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ কম আবাদ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পণ্যটির উৎপাদন হয়েছে ৩৬ লাখ ৪১ হাজার টন। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে পণ্যটির উৎপাদন হয়েছে ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার টন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে পেঁয়াজের চারা রোপণ শুরু হয়। আবার ডিসেম্বর মাসেও রোপণ করা হয়। দেরিতে রোপণ করলে বীজ ফসল কালবৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বর মাসের প্রথম থেকে মাঝামাঝি পেঁয়াজ রোপণের উপযুক্ত সময়। এ সময়ে পেঁয়াজ রোপণ করলে উক্ত বীজ ফসল খুব ভালো ফলন দেয়। এছাড়া কয়েক বছর হলো গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়েছে।









