যাদের সাহসী নেতৃত্বে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, তাদের মধ্যে শফী আহমেদ উজ্জ্বল এক নাম। শফী আহমদে তার লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লড়াইয়ের ইতিহাসে, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক লড়াকু যোদ্ধা হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফী আহমেদকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানিয়েছেন তার বন্ধু, স্বজন, সহযোদ্ধা, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১ টায় শফী আহমেদের কফিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব চলে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এর আগে বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ নেতা শফী আহমেদের জানাজা হয়। আর সোমবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় উত্তরার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে শফী আহমেদের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার মদনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে বুধবার তাকে দাফন করা হবে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নেতৃত্বে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির একদল নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শফী আহমেদের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “শফী আহমেদ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিশ্বাসী প্রগতিশীল চিন্তার একজন মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে সমবেত হন। সেই থেকে তিনি আওয়ামী লীগের একজন বিশ্বস্ত নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তির পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি আমাদের সময়ের সাহসী সন্তান। তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে গড়ায় আপসহীন ছিলেন। তার চেতনা চিন্তায় মানুষের কল্যাণ থাকতো। তার মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’’
নেত্রকোনা-৪ আসনে সংসদ সদস্য সাজ্জাদুল হাসান বলেন, ‘তিনি নেত্রকোনার শুধু কীর্তি সন্তান নন তিনি বাংলাদেশের কীর্তি সন্তান।’
শফী আহমেদের স্ত্রী বাংলাদেশ বিমানের মহাব্যবস্থাপক (মুদ্রণ ও প্রকাশনা) তাহেরা খন্দকার বলেন, ‘‘তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন, আজকে তিনি বিদায় নিলেন। অনেকে তার রাজনীতিতে অপ্রাপ্তি আছে মনে করেন। কিন্তু তিনি সব সময় বলতেন, ‘আমি ভালো আছি। যে রাজনৈতিক আদর্শ আমার আছে, আমি সেটা বুকে ধারণ করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চাই।’ আমার সন্তানদেরও উনি সেই শিক্ষা দিয়েছেন।”
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘‘শফী আহমেদ তরুণ বয়সে যে আদর্শকে বুকে ধারণ করেছিলেন তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং বাঙালি জাতি সত্ত্বার বিকাশ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। আজ শফী আহমেদের মৃত্যুতে সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে আমরা ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদ নেতৃবৃন্দের প্রতি আমরা সম্মাননা প্রদর্শন করছি।’’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ বলেন, ‘‘শফী আহমেদ আদর্শ থেকে এক বিন্দু বিচ্যুত হননি। তার নেতৃত্ব ছিল অতুলনীয়, যা পরিমাপ করা যাবে না। আন্দোলনের বাঁকে বাঁকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেওয়া, সাহস জোগানো সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অতুলনীয়।”
শফী আহমেদ থাকবেন চেতনার অগ্নি বারুদে, সৃষ্টির উৎসবে
শফী আহমেদকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের শোক বইতে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করেন তার সহযোদ্ধা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মরা।

ছাত্র ঐক্য ফোরামের সাবেক সভাপতি ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু লিখেন, ‘‘৮০’র দশকে সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র গণ-আন্দোলনে আমাদের বন্ধু ছাত্রনেতা শফী আহমেদের অন্যন্য ভূমিকা দেশপ্রিয় মানুষের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সে সময় অগ্রণী ও সাহসী ভূমিকা আন্দোলনকে বেগবান করেছে পাশাপাশি তরুণদের প্রতি বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি তৈরি করেছে। বন্ধু শফী আহমেদ, সংগ্রামী অভিবাদন।’’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক সমর ঘোষ লিখেন, ‘গভীর শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। আহত হলো প্রগতিশীলতা ও গণতন্ত্র।’
গণফোরামের পক্ষে মোশতাক আহমেদ লিখেন, ‘শান্তিতে ঘুমাও, আমরা জেগে আছি।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন লিখেন, ‘শফী ভাই সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। তিনি ছিলেন আন্দোলন গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠ কারিগর। আগামীতে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে শফী ভাই অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ হিল কাইয়ূম লিখেন, ‘‘আমাদের প্রিয় সহযোদ্ধা শফী ভাইয়ের অকাল আকস্মিক প্রয়াণ আমাদের ব্যথাতুর করে গেল। শফী ভাই বেঁচে থাকবেন সকল সংগ্রামের মিছিলে, স্লোগানে।’’
রঞ্জন কর্মকার লিখেন, ‘রাজপথের আন্দোলনের প্রিয় সাথী শফী তোমার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তুমি ওপারে ভালো থেকো।’
মোহন রায়হান লিখেন, ‘প্রিয় শফী তুমি থাকবে আমার হৃদয়-মনন চেতনার অগ্নি বারুদে সৃষ্টির উৎসবে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান শোক বইতে লিখেন, ‘‘৯০’এর ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছাত্র নেতৃত্ব শফী ভাইয়র স্মৃতির প্রতি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। শফী ভাইয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে আপোষহীন শপথে নিজেদের বলিয়ান করি।’’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, বাসদ, জেএসিড, ঐক্যন্যাপ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুবমৈত্রী, সমাজচিন্তা ফোরাম, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, গণ সংগীত পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শহীদ মিনারে শফী আহমেদের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।









