বিদায় হজের ভাষণে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।’ এ-কথার মাধ্যমে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কনসেপ্ট ক্লিয়ার করে দিলেন, যা হলো ইসলাম এমন একটি ধর্ম যার মধ্যে মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজেকে আদর্শবান ব্যক্তিত্বে ফুটিয়ে তুলতে পারে৷ এটি মানুষের আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক উন্নতির চাবিকাঠি।
কোরআন ও হাদিসে ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক জায়গায় আলোকপাত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ-বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাকওয়া। তাকওয়া অর্থ আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো এবং মুসলিম অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করো।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০২)
মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে বলার নির্দেশ দেয়ার কারণই হলো ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে। যার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো তাকওয়া। তাকওয়া ব্যক্তিজীবনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সাফল্যের চাবিকাঠি। এটি মানুষকে পাপাচার থেকে বিরত রাখে এবং সৎপথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে৷
যেমন হাদিস শরীফে রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى
“তোমরা সততা অবলম্বন করো, কারণ সততা সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে এবং সৎকর্ম জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৯৪)
এছাড়া ব্যক্তিজীবনে ন্যায়পরায়ণতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। ইসলামে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
ন্যায়পরায়ণতা ব্যক্তিজীবনে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।
ন্যায়পরায়ণতার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য ও সহনশীলতারও। জীবনের ভিন্ন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)
ধৈর্য ব্যক্তিজীবনে মানসিক শক্তি ও স্থিরতা প্রদান করে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
এছাড়াও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অন্যের উপকার কিংবা মানুষের সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পরোপকার ও দানশীলতাকে অত্যন্ত পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: “সর্বোত্তম মানুষ হলো তারা, যারা মানুষের উপকার করে।” (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৩৩৪)
পরোপকারী ব্যক্তি সমাজে সম্মানিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করে। এছাড়াও দানশীলতা, উদারতা ও মহত্ব তাদেরকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করে৷
এছাড়াও একজন ব্যক্তি তার জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সদাচরণ ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমরা অনেকেই ব্যক্তিজীবনে পরিবারের সদস্যদের সাথে সদাচরণ করি না। অথচ রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের প্রতি সদাচরণের উত্তম দৃষ্টান্ত নিজেই স্থাপন করে গিয়েছেন। এটা সুন্নাহও।
ইসলামেও পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সদাচরণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। আর পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)
পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা ব্যক্তিজীবনে শান্তি ও সুখ বয়ে আনে এবং সমাজে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলে। পারিবারিক কলহ পরিবারের শিশুদের জীবনকে দূর্বিষহ করে ও সমাজে সবার কাছে নিন্দনীয় পরিবার হিসেবে পরচিতি পায়। পরিবারের প্রতি সদাচরণের জন্য একজন ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ হৃদয় ও বিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
এ-ব্যাপারে পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا “যে ব্যক্তি তার আত্মাকে শুদ্ধ করল, সে সফলকাম হলো। আর যে ব্যক্তি তার আত্মাকে কলুষিত করল, সে ব্যর্থ হলো।” (সূরা আশ-শামস, ৯১:৯-১০)
বিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী হলেই ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কারণ এটি মানুষকে আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিকভাবে উন্নত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করে। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব মূল্যবোধ অনুসরণ করে আমরা আমাদের ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।









