নিউইয়র্কের নতুন মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি। তিনি শহরটির প্রথম মুসলিম, প্রথম আফ্রিকাজন্ম মেয়র এবং ১৮৯২ সালের পর সবচেয়ে কমবয়সী মেয়র হতে যাচ্ছেন।
আজ (৫ নভেম্বর) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, মাত্র এক বছর আগে প্রায় অখ্যাত এক প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করা মামদানি অল্প অর্থ ও সংগঠনের অভাব সত্ত্বেও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করেছেন। এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
মামদানি মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল শাখার বহুদিনের প্রত্যাশিত এক নেতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তরুণ, উদ্যমী ও সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাচ্ছন্দ্য—এই প্রজন্মের বৈশিষ্ট্যই তার মধ্যে স্পষ্ট। তিনি বিনামূল্যে শিশুসেবা, গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের মতো বামপন্থী নীতি তুলে ধরেছেন। তবে তিনি শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের ভোটারদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়েছিলেন। এ কারণেই তার প্রচারাভিযান কর্মজীবী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ
সমালোচকরা বলছেন, এমন একজন প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসরে নির্বাচনে টিকে থাকতে পারবেন না। রিপাবলিকানরা তাকে চরম বামপন্থার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। তবে নিউইয়র্ক সিটিতে মঙ্গলবার রাতে মামদানি প্রমাণ করেছেন, অন্তত এই শহরে সেই সমালোচনা টেকেনি। কুয়োমোর মতো প্রভাবশালী সাবেক গভর্নরকে হারিয়ে মামদানি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পুরনো ধারা ভেঙেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তার প্রচারণা দেশজুড়ে বিশাল গণমাধ্যম কাভারেজ পেয়েছে, যা সাধারণত একটি সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিরল। তাই সামনে তার চ্যালেঞ্জও বেশি।
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা
তবে এখন তাকে মোকাবেলা করতে হবে প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল ইতিমধ্যেই বলেছেন, মামদানির উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধরনের কর বৃদ্ধির প্রয়োজন, তিনি তা সমর্থন করবেন না।
এছাড়া সিটি কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোনো বড় কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কর্পোরেট ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচক হিসেবে প্রচারণা চালানো মামদানিকে এখন সেই প্রভাবশালী শ্রেণির সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় যেতে হতে পারে।

ইসরায়েল বিতর্ক
গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে মামদানি ঘোষণা করেছিলেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে পা রাখলে তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হবে। এই অবস্থান ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব
নিউইয়র্কের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে মামদানি এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত মুখ। সাম্প্রতিক সিবিএস জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনদের ৪৬ শতাংশই নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন খুব একটা খেয়াল করেননি। ফলে তার সামনে সুযোগ রয়েছে নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলার।অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যেই মামদানিকে বিপজ্জনক সমাজতন্ত্রী হিসেবে চিত্রিত করার প্রচারণা শুরু করেছে। ট্রাম্প নিউইয়র্কের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে মামদানির জন্য নতুন বাধা তৈরি করতে পারেন।
সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ
ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক শুমারের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা তার প্রচারণায় পাশে না থাকলেও, মামদানির জয়ে এখন তারা নতুনভাবে তার সঙ্গে কাজ করার চাপের মুখে পড়েছেন। জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর তিনি নিজের ভাবমূর্তি গঠনের নতুন সুযোগ পাবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্ভাব্য দ্বন্দ্বই তাকে জাতীয় মঞ্চে আরও পরিচিত করে তুলতে পারে। যেমনটি একজন বিশ্লেষক লিখেছেন, মামদানির প্রতিভা ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাকে এখানে পর্যন্ত এনেছে—কিন্তু আসল পরীক্ষা এখন শুরু।
প্রগতিশীলদের ঐক্য
মঙ্গলবারের নির্বাচনে শুধু নিউইয়র্ক নয়, নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়াতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন ডেমোক্র্যাট পার্টির বাম ও কেন্দ্রপন্থী উভয় ধারা আপাতত একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
নিজের বিজয়োত্তর ভাষণে মামদানি বলেন, এই দলটি এমন হতে হবে যেখানে প্রতিটি মার্কিন নিজেদের দেখতে পায়। আমরা যারা লড়ছি, তাদের উদ্দেশ্য একটাই—কর্মজীবী মানুষের সেবা করা।









