বাগেরহাট থেকে যশোর কতদূর? প্রায় ৫০ মাইল। এই পথ ধরে প্রতিদিন চলে বাস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি। কিন্তু এই একই পথে আটকে যায় একটি অনুমোদনের কাগজ—প্যারোলের কাগজ। আর সেখানেই প্রশ্ন উঠে আসে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মানবিকতার মানদণ্ড নিয়ে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ দেখার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির কোনো আবেদন করা হয়নি।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলগেটেই মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে জানিয়েছে যশোর জেলা প্রশাসক।
স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় আসতে জুয়েলকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।
রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দামের পরিবার প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করেনি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক বন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর কোনো আবেদন করা হয়নি।’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জুয়েলের পরিবারের মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী যশোর জেলগেটে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসন ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যশোর জেলা প্রশাসক বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছে মর্মে প্রকাশিত সংবাদটি সঠিক নয় বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়ার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করেছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।
রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসক জানান, প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত একটি আবেদন শুক্রবার তার বাংলোতে আসে। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর তিনি কারা কর্তৃপক্ষকে জানান। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সাদ্দাম যেহেতু জেলার বাইরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন, তাই ২০১৬ সালের কারা আইন অনুযায়ী প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। আবেদনকারীদের বিষয়টি জানানো হলে তারা সন্তোষ প্রকাশ করে চলে যান। এরপর এ বিষয়ে সাদ্দমের পরিবার আর কোনো যোগাযোগ করেনি।
জুয়েলের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিন জানান, গত ২৩ জানুয়ারি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্যারোলে মুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসক তাকে বাগেরহাট জেলা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান।
সেখানে জানানো হয়, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। আইন অনুযায়ী যেই কারাগারে আসামি বন্দি আছেন, সেখানেই আবেদন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে আর কোনো উপায় না পেয়ে যশোর কারাগারে মরদেহ নিয়ে গেলে মাত্র তিন মিনিটের জন্য দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ জানান, সাদ্দামকে গত ১৫ ডিসেম্বর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় এবং তিনি বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় সেখানে আটক রয়েছেন। সব নিয়ম মেনে সন্ধ্যার পর মরদেহ দুটি কারাগারের গেইটে আনা হয়। শেষ দেখা শেষে সাদ্দামকে আবার তার নিজ ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।
জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার রাতে সাদ্দামের শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন বাগেরহাট মডেল সদর থানার ওসি মো. মাসুম খান।
শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে রাত ১২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ও শিশুসন্তানের।
কিন্তু দাফনের আগে পিতা জুয়েলের সঙ্গে শিশুটির শেষ সাক্ষাৎ হয় যশোর কারাগারের গেটে। তিনি বাচ্চাটাকে আর কোলে নেননি। স্বজনদের বলেছেন জীবিত থাকতেই তো নিতে পারলাম না। এখন আর নিয়ে কী করবো।
এরপর বাচ্চাটার মাথায় বুলিয়ে বলেন- আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস। স্ত্রীকে বলেন- ভালো স্বামী হতে পারি নাই, ক্ষমা করিস।
‘‘মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে’’—কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের এই লাইনটি ভাইরাল হলে তা ব্যবহার করে পোস্টার ও ফটোকার্ড শেয়ার করে প্রতিবাদ জানান বহু মানুষ।
গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের স্বামীর বাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল শনিবার দুপুরে মা ও ছেলের মরদেহ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সুবর্ণার বাবার বাড়িতে আনা হয়। সেখানে গোসল শেষে বিকেল সোয়া চারটার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাঁদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন জুয়েল।
জানা যায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে গোপালগঞ্জ থেকে গত বছর ৫ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি একাধিক মামলায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
পাঁচ বছর আগে ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের সাথে কানিজ সুর্বণার বিয়ে হয়। সম্প্রতি রাজনৈতিক মামলায় স্বামীর গ্রেপ্তার নিয়ে হতাশায় ভুগছিলেন। স্বামীকে মুক্ত করতে চেষ্টা করছিলেন তিনি।









