ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লব শুধু পশ্চিমা রাজতন্ত্রকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করেনি, বরং এটি দেশটির দৃশ্যমান সংস্কৃতিকেও নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল।
নতুন রাষ্ট্র খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিল যে সিনেমা জনমানস ও স্মৃতি গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাই তারা এর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে- চিত্রনাট্য, শুটিং, সম্পাদনা ও প্রদর্শনের জন্য আলাদা অনুমতি; পোশাক, চুল, স্পর্শ ও আচরণের নৈতিক কোড; এবং রাজনীতি, যৌনতা, ধর্ম ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘিরে কঠোর সেন্সরশিপ।
একই সময়ে, পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হক ‘ইসলামায়ন’ কর্মসূচি চালাচ্ছিলেন। বেগম নুসরাত ভুট্টো ও বেনজির ভুট্টোর মতো শক্তিশালী নারী নেত্রীর চ্যালেঞ্জে বিপর্যস্ত হয়ে তিনি সৃজনশীল ও অভিনয় শিল্পের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেন, গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রে কড়া সেন্সরশিপ চাপান।

কিন্তু যেখানে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্প ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, সেখানে ইরানের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি এক ভিন্ন পথ নেয়। কঠোর বিধিনিষেধের মাঝেই সেখানে জন্ম নেয় বিশ্বের অন্যতম সৃজনশীল চলচ্চিত্র ধারার।
ইরানি চলচ্চিত্র আজও সমাজের আয়না এবং বিশ্ব সিনেমার জন্য আলোর দিশারি- নীরব অথচ শক্তিশালী, সীমাহীন উদ্ভাবনী ও গভীরভাবে মানবিক। যেখানে পাকিস্তানের ১৯৮০-এর দশকের রাজনৈতিক আবহ সিনেমাকে স্তব্ধ করেছিল, ইরানে ঠিক সেই দমনই জন্ম দিয়েছিল নতুন ভাষা খোঁজার প্রয়াসকে।
এর মূল কারণ, ইরানি পরিচালকরা শিখেছিলেন ঘুরিয়ে কথা বলতে! প্রতিদিনের জীবনের গল্পে লুকিয়ে রাখতেন রাজনৈতিক সমালোচনা, শিশু ও গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তুলতেন প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের উদ্বেগ, আর বাস্তবতাকে রূপান্তর করতেন রূপকথায়। যুদ্ধ, নগরায়ণ, নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, লিঙ্গবিচ্ছেদ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বাস্তবতাকে চার দশক ধরে তারা সূক্ষ্মভাবে রূপায়িত করেছেন।
এখন অনেক সমালোচকই বলেন, দমনই ইরানের শিল্পকে শাণিত করেছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সেই বিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে: কীভাবে রাষ্ট্রের আরোপিত নীরবতার ভেতর জন্ম নিয়েছিল প্রতীক, ইঙ্গিত আর নৈতিক অনুসন্ধানের এক সিনেমা, যেখানে শিল্পীরা বারবার ফর্মকে নতুন করে সাজিয়েছেন শুধু টিকে থাকার জন্যই নয়, অর্থবহ করে তোলার জন্য।
১৯৮০-এর দশকে “কালচারাল রেভুল্যুশন” বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে রূপান্তর করে ইসলামি মতাদর্শের যন্ত্রে। একই সময়ে ফারাবি সিনেমা ফাউন্ডেশন ও ফজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের জন্য কাঠামো তৈরি করে দেয়। শিশু চরিত্র, গ্রামীণ প্রেক্ষাপট, নৈতিক রূপক ও প্রতীকী গল্প বলার কৌশল হয়ে ওঠে সেন্সরশিপ এড়ানোর প্রধান ফর্মুলা।
কিয়ারোস্তামি, মাখমালবাফ, দারিয়ুস মেহেরজুই, বেইজাই, মাজিদ মাজিদি- এরা সীমাবদ্ধতার ভেতর দাঁড়িয়েই গড়ে তোলেন এক অভিনব চলচ্চিত্র ভাষা। লম্বা শট, অপেশাদার অভিনেতা,মুক্ত সমাপ্তি- সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক নন্দনকৌশল যা বাইরে থেকে সাদামাটা মনে হলেও ভেতরে ছিল স্তরের পর স্তর ব্যঞ্জনা!

১৯৯০-এর দশকে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ও সংস্কারপন্থী রাজনীতির উত্থানে ইরানি সিনেমা বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তোলে। কিয়ারোস্তামির ক্লোজ-আপ এবং টেস্ট অব চেরি, পানাহির দ্য সার্কেল বা সামিরা মাখমালবাফের দ্য অ্যাপল- সবই নতুন যুগের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
২১ শতকে এসে ইরানি সিনেমা আরও স্পষ্টভাবে সমাজের জটিলতা, ন্যায়-অন্যায়, শ্রেণি-বৈষম্য ও লিঙ্গরাজনীতিকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আসগর ফারহাদির মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা (আ সেপারেশন, দ্য সেলসম্যান) কিংবা পানাহির প্রতিবাদী মিনিমালিস্টিক সিনেমা (দিস ইস নট আ ফিল্ম, ট্যাক্সি) এই ধারার উজ্জ্বল উদাহরণ।
মোহাম্মদ রাসুলফ, সাঈদ রুস্তাই, আলি আসগারি- নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় দমন, সামাজিক অবিচার ও পারিবারিক সংকটকে সিনেমার বিষয় করছেন। নারী চলচ্চিত্রকাররাও (রখশন বানী-এতেমাদ, নারগেস আব্যার, মাহনাজ মোহাম্মদী) নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছেন। প্রবাসী পরিচালকরা (মারজান শতরাপি, আলি আব্বাসি) ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানি পরিচয়কে নতুনভাবে দেখাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানি সিনেমার ইতিহাস দেখায়- সীমাবদ্ধতা ও দমন যেমনই হোক না কেন, শিল্প তার ভাষা খুঁজে নেয়। পাকিস্তানের মতো একই রাজনৈতিক আবহে যেখানে সিনেমা হারিয়ে যায়, ইরানে ঠিক সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রতীক, রূপক ও মানবতাবোধে ভরা এক চলচ্চিত্র সংস্কৃতি- যা আজও বিশ্ব সিনেমার জন্য এক আলোকবর্তিকা। ডন









