শেষ রানটির জন্য সাউথ আফ্রিকাকে মোকাবেলা করতে হয়েছিল চারটি বল। মিচেল স্টার্কের প্রথম তিনটি বল খেলারই চান্স পাননি কাইল ভেরেইনা। চতুর্থ বলে ওয়াইড ফুলটস ডেলিভারি কাভার পয়েন্টে পাঠিয়ে রান আদায় করেই বুনো উল্লাসে মাতেন ভেরেইনা ও ডেভিড বেডিংহ্যাম। ক্যামেরা ছুটে যায় লর্ডসের প্যাভিলয়নে, অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার চোখে পানি। অবশেষে ‘চোকার’ তকমাটা কাটল নামের পাশ থেকে। লর্ডসে ইতিহাস গড়ে ২৭ বছর আইসিসির দ্বিতীয় শিরোপা জিতল প্রোটিয়ারা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে সাদা পোশাকে বিশ্বসেরার মুকুট জিতল সাউথ আফ্রিকা।
আইসিসির বৈশ্বিক আসর এর আগে কেবল একটি শিরোপাই ঘরে তুলেছিল সাউথ আফ্রিকা। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় আইসিসি নকআউট ট্রফি (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি) জিতেছিল তারা। এরপর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১২ বার সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা (চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি-৫, ওয়ানডে বিশ্বকাপ-৩, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ-২ বার)। সবশেষ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে টসে হেরে আগে ব্যাটে নামে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ২১২ রানে থামে অজিদের ইনিংস। জবাবে নেমে ১৩৮ রানে গুটিয়ে যায় সাউথ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস। ৭৪ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া থেমেছে ২০৭ রানে। অজিদের লিড দাঁড়ায় ২৮১ রান। ২৮২ রানের লক্ষ্যে নেমে এইডেন মার্করামের সেঞ্চুরি ও বাভুমার ফিফটিতে টেস্টে প্রথমবার বিশ্বসেরার মুকুট ঘরে তুলেছে প্রোটিয়া বাহিনী।
লর্ডসে সাউথ আফ্রিকার সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড এটি। এর আগে লক্ষ্য তাড়ায় নেমে কেবল একবার টেস্ট জিতেছে প্রোটিয়ারা, ১৯৯৮ সালে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪ রান তাড়া করে। ঐতিহ্যবাহী ভেন্যুতে চতুর্থ ইনিংসে প্রোটিয়াদের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও এটি। এর আগে কখনো ১১৯ রানের বেশি করতে পারেনি সাউথ আফ্রিকা। টেস্টে এ নিয়ে ষষ্ঠবার ২৫০এর বেশি রান তাড়া করে জিতেছে সাউথ আফ্রিকা। যার চারবারই অজিদের বিপক্ষে। সবশেষ ২০০৮ সালে পার্থে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৩ রান তাড়া করে তারা। ১৭ বছর পর আবারও অজিদের বিপক্ষে ২৫০+ রান তাড়া করে জিতেছে প্রোটিয়া বাহিনী।
চতুর্থ দিনে শিরোপা থেকে কেবল ৬৯ রান দূরে ছিল সাউথ আফ্রিকা। হাতে ছিল ৮ উইকেট। চতুর্থ দিনের শুরুতেই বাভুমার উইকেট হারায়। ১৩৪ বলে ৬৬ রান করেন প্রোটিয়া অধিনায়ক। দলীয় ২৪১ রানে ত্রিস্তান স্টাবস ফিরে যান ৮ রান করে। ডেভিড বেডিংহ্যামকে নিয়ে এইডেন মার্করাম জয় থেকে ৬ রান দূরে থাকতে আউট হন। প্রোটিয়া ওপেনার ১৪টি চারে ২০৭ রানে ১৩৬ রান করেন। পরে কাইল ভেরেইনাকে নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন বেডিংহ্যাম। বেডিংহ্যাম ২১ রানে এবং ভেরেইনা ৪ রানে অপরাজিত থাকেন।
অজি বোলারদের মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে মিচেল স্টার্ক ৩ উইকেট নেন। জশ হ্যাজেলউড ও প্যাট কামিন্স একটি করে উইকেট নেন।
বুধবার ফাইনালের প্রথমদিন ব্যাটে নেমে কাগিসো রাবাদার তোপে ২১২ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটারদের মধ্যে বাউ ওয়েবস্টার ৭২ রান এবং স্টিভেন স্মিথ ৬৬ রান করেন। এছাড়া অ্যালেক্স ক্যারি ২৩ রান এবং মার্নাস লাবুশেন ১৭ রান করেন।
প্রথম ইনিংসে প্রোটিয়া পেসার কাগিসো রাবাদা ১৫.৪ ওভার বল করে ৫১ রান খরচায় নেন ৫ উইকেট। টেস্টে এক ইনিংসে রাবাদার ১৭তম ফাইফার এটি। মার্কো জানসেন ১৪ ওভারে ৪৯ রান খরচায় নেন ৩ উইকেট। কেশভ মহারাজ ও এইডেন মার্করাম নেন একটি করে উইকেট।
২১২ রান সামনে রেখে সাউথ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে নেমে প্যাট কাম্ন্সি তোপে ১৩৮ রানে গুটিয়ে যায়। প্রথম ইনিংসে প্রোটিয়া ব্যাটারদের মধ্যে ৪৫ রান করেন ডেভিড বেডিংহ্যাম। ৩৬ রান আসে অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার ব্যাট থেকে। এছাড়া রায়ান রিকেলটন ১৬ এবং কাইলে ভেরেইনা ১৩ রান করেন।
বল হাতে অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ২৮ রানে ৬ উইকেট নেন। যা লর্ডসে ১৪১ বছরের টেস্ট ইতিহাসে কোনো অধিনায়কের সেরা বোলিং। একইসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ষষ্ঠ পেসার ও অষ্টম বোলার হিসেবে টেস্ট ক্যারিয়ারে ৩০০ উইকেট পূর্ণ করেছেন ৩২ বর্ষী ক্রিকেটার। অধিনায়ক হিসেবে কামিন্স এই নিয়ে ৯ বার পাঁচ উইকেটের স্বাদ পেলেন। এখানে তার ওপরে আছেন কেবল ইমরান খান (১২)। কামিন্সের সমান ৯ বার পেয়েছেন রিচি বেনো। এছাড়া মিচেল স্টার্ক নেন ২টি এবং জশ হ্যাজেলউড একটি উইকেট নেন।
৭৪ রানে এগিয়ে থেকে ব্যাটে নেমে দ্বিতীয় ইনিংস ২০৭ রানে থামে অজিরা। তাতে মোট লিড দাঁড়ায় ২৮১ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটে নেমে অজিদের সর্বোচ্চ রান আসে মিচেল স্টার্কের ব্যাট থেকে। ৫৮ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। নয় নম্বরে নেমে স্টার্কের অষ্টম ফিফটি এটি। টেস্ট ইতিহাসে নয় বা তার নিচে নামা ব্যাটারের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ফিফটির রেকর্ড। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্টুয়ার্ট ব্রডের ৬টি ফিফটি। এছাড়া অ্যালেক্স ক্যারি করেন ৪৩ রান।
ক্যারি ও স্টার্ক ছাড়া অজি ব্যাটারদের মধ্যে দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছান কেবল দুজন। মার্নাস লাবুশেন ২২ রানে এবং স্টিভেন স্মিথ ১৬ রানে ফিরে যান।
দ্বিতীয় ইনিংসে প্রোটিয়া বোলারদের মধ্যে কাগিসো রাবাদা ৪ উইকেট নেন। লুনগি এনগিদি শিকার করেন ৩ উইকেট। মার্কো জানসেন, উইয়ান মুল্ডার ও এইডেন মার্করাম নেন একটি করে উইকেট।
২৮২ রানের লক্ষ্যে নেমে মার্করাম ও বাভুমার ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় সাউথ আফ্রিকা। তৃতীয় দিনে মধাহ্ন বিরতির কিছু সময় পর ব্যাটে নামে সাউথ আফ্রিকা। লক্ষ্যতাড়ায় নেমে শুরুতেই উইকেট হারায় দলটি। দলীয় ৯ রানে ওপেনার রায়ান রিকেলটন ফিরে যান ৬ করে। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে মুল্ডার ও মার্করাম মিলে যোগ করেন ৬১ রান। দলীয় ৭০ রানে মুল্ডার ফিরে গেলে জুটি ভাঙে। ৫০ বলে ২৭ রান করেন প্রোটিয়া টপঅর্ডার। এরপর টেম্বা বাভুমাকে নিয়ে ১৪৩ রানের অপ্রতিরোধ্য জুটি গড়ে দিনের খেলা শেষ করেন মার্করাম।
১১টি চারে ১৫৬ বলে সেঞ্চুরি করেন মার্করাম। টেস্টে মার্করামের অষ্টম সেঞ্চুরি এটি। ৮৩ বলে ফিফটি করা বাভুমা দিন শেষ করেন ৬৫ রানে। এরপর চতুর্থদিনে নেমে মহাকাব্য রচনা করে সাউথ আফ্রিকা।









