২০২২ সালে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের এক চোখ ধাঁধানো চুক্তিতে টুইটার কিনে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। কিন্তু নগদ অর্থে নয়, এই বিশাল অঙ্কের লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল মূলত নিজের সম্পদ, বিশেষত তার সবচেয়ে মূল্যবান হীরা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারকে ভিত্তি করে।
আড়াই বছর পর, সেই টেসলার শেয়ারের দাম যখন বাজারের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে নিম্নমুখী এবং নতুন মালিকানাধীন এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মটিও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন প্রশ্ন উঠছে মাস্ক কি তার নেয়া ঋণের জালে নিজেই জড়িয়ে পড়ছেন? এই প্রতিবেদন সেই জটিল সমীকরণটিই বিশ্লেষণ করবে।
টুইটার কেনার জন্য মাস্ক নিজের বিপুল পরিমাণ টেসলা শেয়ার বিক্রি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পুরো অর্থ সংস্থান হয়নি। একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছিল ঋণের মাধ্যমে। এর মধ্যে কিছু ঋণ সরাসরি টুইটারের ওপর বর্তালেও, মাস্কের ব্যক্তিগত ইক্যুইটি অবদানের জন্যও তাকে ব্যক্তিগত ঋণ নিতে হয়েছে, যার জামানত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তার অবশিষ্ট টেসলা শেয়ার। এখানেই তৈরি হয়েছে ঝুঁকির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
একসময় বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার হরিণ হিসেবে বিবেচিত টেসলার শেয়ার সাম্প্রতিক সময়ে বেশ চাপের মুখে। এর কারণগুলো বহুমাত্রিক:
প্রতিযোগিতা: চীনা সংস্থা বিওয়াইডিসহ অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতারা বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে দ্রুত প্রবেশ করছে, যা টেসলার একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ: বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় দামী গাড়ির চাহিদা কিছুটা কমেছে। মাস্ক ফ্যাক্টর: এক্স (টুইটার)-এ মাস্কের অতিরিক্ত মনোযোগ এবং তার কিছু বিতর্কিত মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত টেসলার ব্র্যান্ড ইমেজ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
বাজার পরিসংখ্যান (এপ্রিল ২০২৫): যদিও টেসলা এখনও একটি অত্যন্ত মূল্যবান কোম্পানি, এর শেয়ারের দাম তার সর্বোচ্চ থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে নিচে অবস্থান করছে এবং গত এক বছরে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের পতনের সম্মুখীন হয়েছে।
যেসব ঋণের বিপরীতে শেয়ার জামানত রাখা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে শেয়ারের দাম একটি নির্দিষ্ট স্তরের নিচে নেমে গেলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত জামানত দাবি করে। একেই বলে ‘মার্জিন কল’।
মাস্কের ক্ষেত্রে, টেসলার শেয়ারের দাম যদি আরও পড়তে থাকে, তবে তাকে এই মার্জিন কলের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এর অর্থ দাঁড়াবে:
১. হয় তাকে আরও টেসলা শেয়ার জামানত রাখতে হবে।
২. অথবা নগদ অর্থ দিয়ে ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করতে হবে।
৩. অথবা শেয়ার বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যা বাজারে টেসলার শেয়ারের ওপর আরও বিক্রির চাপ তৈরি করবে।
এতেই স্পষ্ট হয় সেই ধারণাটি কাগজে-কলমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া আর হাতে নগদ অর্থ থাকা এক জিনিস নয়। মাস্কের ‘নেট ওয়ার্ক’ বা মোট সম্পদের পরিমাণ টেসলার শেয়ারের দামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং অত্যন্ত পরিবর্তনশীল।
মাস্ক টুইটারকে ‘এক্স’ নামে রিব্র্যান্ড করে এটিকে একটি ‘সবকিছুর অ্যাপ’ বানানোর স্বপ্ন দেখছেন।
বিজ্ঞাপন আয়: অনেক বড় বিজ্ঞাপনদাতা মাস্কের কন্টেন্ট মডারেশন নীতি এবং প্ল্যাটফর্মের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিজ্ঞাপন দেয়া কমিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে।
সাবস্ক্রিপশন মডেল: ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সাবস্ক্রিপশন ফি আদায়ের চেষ্টা চললেও, তা বিজ্ঞাপনের ক্ষতি পূরণ করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি।
ব্যবহারকারী ও আস্থা: প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবহারকারীদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ রয়েছে। এক্স-কে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা মাস্কের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, যা তার সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
চাপের মুখে মাস্ক: ‘ধনী সমস্যা’র বাস্তবতা একদিকে টেসলার ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ ও শেয়ারের দরপতন, অন্যদিকে এক্স-কে লাভজনক করার পাহাড়সমান চাপ–এই দ্বৈত সংকটের প্রভাব মাস্কের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে বা বক্তব্যেও দৃশ্যমান বলে মনে করছেন অনেকে। এটিই হলো ‘ধনী সমস্যা’র বাস্তব উদাহরণ।
যেখানে সম্পদের বিশালতা যেমন অপার সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনই সামান্য বিচ্যুতি বা ভুল পদক্ষেপ বিশাল আকারের ঝুঁকিও ডেকে আনে। লিভারেজ বা ঋণের সুবিধা এখানে উভয় দিকেই ধারালো তলোয়ারের মতো কাজ করে।
ইলন মাস্কের অতীত ইতিহাস বলে, তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ফিরে আসতে সিদ্ধহস্ত। স্পেসএক্স বা টেসলার প্রাথমিক দিনগুলোর সংগ্রাম তার উদাহরণ। টেসলার নতুন পণ্যের সম্ভার (যেমন সাইবারট্রাক, এআই প্রযুক্তি) এবং এক্স-এর নতুন ফিচার হয়তো ভবিষ্যতে সুদিন ফেরাতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান আর্থিক চাপ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং তার নিজের নেয়া উচ্চ ঝুঁকির সিদ্ধান্তগুলো কি তাকে সেই সুযোগ দেবে? টেসলার শেয়ারের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং এক্স-এর ব্যবসায়িক সাফল্যই বলে দেবে ইলোন মাস্ক এই জটিল পরিস্থিতি থেকে কতটা সাফল্যের সাথে বেরিয়ে আসতে পারবেন।









