নির্বাক সিনেমার এক কিংবদন্তীর নাম, চার্লি চ্যাপলিন। কৌতুককে অস্ত্র করে তিনি স্পর্শ করে গেছেন মানুষের সবচেয়ে আলোকিত স্থান থেকে সবচেয়ে অন্ধকার স্থানে। ছিলেন তীব্র মানবতাবাদী। সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রতিবাদী আত্মার এক ইমেজ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
হাস্যরসে মোড়ানো তার সিনেমার পরতে পরতে আছে সমাজ, রাজনীতি ও সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার সাহস। তার সবচেয়ে প্রতীকী ও প্রতিবাদী সৃষ্টি—‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ (১৯৪০)। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যে সিনেমায় দোর্দণ্ডপ্রতাপে চ্যাপলিন উচ্চারণ করেছিলেন অনন্য যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠস্বর! যা যুগে যুগে মানুষকে যুদ্ধবিরোধী শিক্ষা দিয়ে আসছে।
‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’— রাজনৈতিক স্যাটায়ারে পূর্ণ একটি সিনেমা। ১৯৪০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি সেই সময়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে। এটি চ্যাপলিনের প্রথম সবাক ছবি। নিরবতা ভেঙে এই সিনেমায় কথা বলেন চ্যাপলিন। এমন কথাই তিনি উচ্চারণ করেন— যা আজও পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে স্তম্ভিত করে। নত হতে শেখায়। যুদ্ধ বিগ্রহ বিরোধী মনোভাব তৈরীতে আজও মানুষকে বার্তা দিয়ে যায়!
সিনেমাটি সেই সময়ে জার্মানসহ বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী সরকার নিষিদ্ধ করে। এই সিনেমায় চ্যাপলিনের দেওয়া একটি ভাষণ গণতন্ত্রকামী প্রতিটি দেশের মানুষের কাছে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বলা হয়ে থাকে— মানবিক চেতনার সবচেয়ে সরাসরি রাজনৈতিক রূপ চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’।
চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট হিটলার-শাসিত জার্মানি ও নাৎসি রাজনীতির ব্যঙ্গাত্মক প্রতিরূপ। চ্যাপলিন এখানে দুটি চরিত্রে অভিনয় করেন—একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক অ্যাডেনয়েড হিন্কেল, যিনি হিটলারের প্রতিচ্ছবি। আর অন্যজন এক সাধারণ ইহুদি নাপিত, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। দুটি চরিত্র, দুটি পৃথিবী। এবং চ্যাপলিন এই দুজনের দ্বৈরথে বিশ্বরাজনীতির একটি স্পষ্ট চিত্র এঁকেছিলেন।
এই সিনেমাতেই মানবতার পক্ষের অনবদ্য ঘোষণাপত্র পাঠ করেন চ্যাপলিন। সিনেমার শেষাংশে চ্যাপলিন ভুলবশত স্বৈরশাসকের আসনে উঠে এসে এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন। এটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগময় যুদ্ধবিরোধী ভাষণ হিসেবে পরর্তীতে লিপিবদ্ধ হয়। সিনেমার মধ্য দিয়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা ছিলো সেই ভাষণে!
বর্তমান বিশ্বেও ঘৃণা, স্বার্থ, বিভাজনের রাজনীতি ফিরে এসেছে নতুন রূপে। বিশ্বজুড়ে চলছে যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ফ্যাসিবাদের উত্থান। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েলের অমানবিক আগ্রাসনে বিশ্বমানবতা আজ বিপর্যস্ত! এমন সময় চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’-এর মত চলচ্চিত্র ও চ্যাপলিনের ভাষণ স্মরণ করিয়ে দেয়, শিল্প শুধু বিনোদনের জন্য নয়—এটি প্রতিবাদের, মানবতার, এবং সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হাতিয়ারও হতে পারে।
প্রায় ৮৫ বছর আগের এই সিনেমাটি দেখে এই সময়েও মনে হবে, কী তুমুল প্রাসঙ্গিক! একজন সত্যিকারের শিল্পী হয়তো এভাবেই বেঁচে থাকেন, যুগের পর যুগ। শতকের পর শতক! যুদ্ধবিরোধী এক অনন্ত প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি হয়ে চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ সিনেমাটিও টিকে থাকবে। যুগ থেকে যুগান্তরে।









