মেধা, অধ্যবসায় আর দৃঢ় মনোবল—এই তিনের সুন্দর সমন্বয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন এক তরুণী। তিনি তাশরিফা ফাইরুজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী, যিনি ২০২৩ সালের এম. এ ইন ইংলিশ (ইএলটি) পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করে অর্জন করেছেন ডিন’স অ্যাওয়ার্ড।
তার প্রাপ্ত সিজিপিএ ৩.৭৬ (স্কেল ৪.০০), যা একাডেমিক উৎকর্ষতার স্পষ্ট পরিচায়ক। এ অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের নয়, তার পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
পরিশ্রমে গড়া পথচলা
তাশরিফা ফাইরুজের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ছিল মেধা ও পরিশ্রমের অনন্য সমন্বয়। তিনি ও-লেভেল পরীক্ষায় ৫.০০ জিপিএ এবং এ-লেভেল পরীক্ষায় ৪.২৫ জিপিএ অর্জন করেন। একের পর এক সাফল্য তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের নতুন আলো জ্বেলে দেয়।
তাশরিফা ফাইরুজ বলেন, আমার প্রতিটি সাফল্যের পেছনে আছে পরিবারের অবিচল সমর্থন আর শিক্ষকদের প্রেরণা। কখনও কখনও মনে হতো লক্ষ্যটা অনেক দূরের, কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টাগুলোই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।
ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহ
ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও শিক্ষণ (ইএলটি) বিষয়ে তাশরিফার বিশেষ আগ্রহ তাকে এই বিষয়টি বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ভাবনারও শক্তি। তিনি ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন কিছু যোগ করার স্বপ্ন দেখেন। আমি চাই, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ইংরেজিকে ভয় না পেয়ে ভালোবাসুক—এই ভালোবাসাটাই আমার কাজের মূল অনুপ্রেরণা, বলেন তাশরিফা।
পরিবারের গর্ব ও আনন্দ
তাশরিফা ফাইরুজের বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং মা তাহমিনা আখতার—দুজনেই কন্যার সাফল্যে গর্বিত ও আবেগাপ্লুত। বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার মেয়ের এমন অর্জন আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়। সে ছোটবেলা থেকেই মনোযোগী ও আত্মবিশ্বাসী। আমরা শুধু তার সফলতা নয়, তার মানবিক মূল্যবোধেও গর্ব করি।
মা তাহমিনা আখতার যোগ করেন, তাশরিফা ছোটবেলা থেকেই বই ভালোবাসে। ওর এই সাফল্য অনেক ত্যাগ ও ধৈর্যের ফসল। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি—ও যেন আরও বড় কিছু করতে পারে।
মানবিক কাজ ও সামাজিক সচেতনতা
শিক্ষার পাশাপাশি তাশরিফা ফাইরুজ নিয়মিত মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের মাধ্যমে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, পথশিশুদের পাঠদান ও নারীর অধিকার বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ নেন।
তাশরিফা বলেন, আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিক্ষা তখনই পূর্ণ হয়, যখন সে সমাজের জন্য কিছু করতে পারে। আমার সামান্য অবদান যদি কারও মুখে হাসি ফোটাতে পারে, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। তার এই মানবিক কাজ বাবা,মা,আত্বীয় পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকদের, কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক জানান, তাশরিফা শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী নয়, সে সমাজসচেতন ও মানবিকও। একাডেমিক দক্ষতার পাশাপাশি তার দায়িত্ববোধ সত্যিই প্রশংসনীয়।
অনুপ্রেরণার গল্প
শিক্ষকরা জানান, তাশরিফা সবসময় ক্লাসে সক্রিয় থাকতেন এবং সহপাঠীদের সাহায্য করতে আগ্রহী ছিলেন। তার বিনয়, আন্তরিকতা এবং পড়াশোনার প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে সবার কাছে অনুকরণীয় করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, তাশরিফা আমাদের বিভাগের এক উজ্জ্বল শিক্ষার্থী। তার মনোযোগ ও গবেষণামুখী দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে একাডেমিক জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
তাশরিফা ফাইরুজ বর্তমানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক ও গবেষক হওয়া। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এমন এক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করবেন, যেখানে শেখা হবে আনন্দময়, অনুপ্রেরণামূলক ও সৃজনশীল। তার ভাষায়,ডিন’স অ্যাওয়ার্ড আমার কাছে শুধু একটি সম্মান নয়, এটি দায়িত্বও বটে। আমি চাই এই অর্জন আমাকে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আরও নিবেদিত করে তুলুক।
তাশরিফা ফাইরুজের এই অর্জন আজ হাজারও তরুণ-তরুণীর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। কঠোর পরিশ্রম, সৎ ইচ্ছা আর অবিচল অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য আসবেই এই বার্তাই তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজের জীবনের মাধ্যমে।তার সাফল্যের গল্প একটাই কথা বলে—স্বপ্ন যারা দেখে এবং তার জন্য লড়তে জানে, তারাই একদিন ইতিহাস লেখে।








