নেপালে ‘জেন-জি’ আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো সব বন্দি যদি ফিরে না আসে, তবে বিশেষ নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে। দেশটির কেন্দ্রীয় কারাগারের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহাপরিচালক চমেন্দ্র ন্যুপানের তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত পর্যন্ত ১১ হাজার বন্দি পলাতক রয়েছেন।
সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের কারা ব্যবস্থাপনা বিভাগ শুক্রবারের মধ্যে জেল পলাতকদের ফিরে আসার আহ্বান জানালে তখন কিছু বন্দি ফিরতে শুরু করেন। তাৎক্ষণিকভাবে আরও কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে। তবে গত কয়েকদিনে যারা পালিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই এখনও কারাগার ও কিশোর সংশোধনাগারে ফিরে আসেননি।
কারাগারে ফেরানোর উদ্যোগ
কারা ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহাপরিচালক চমেন্দ্র ন্যুপানে বলেছেন, ‘যে সব অপরাধীরা ফিরতে চাচ্ছে না, তাদেরকে শিগগিরই আটক করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমরা ইতিমধ্যে বন্দিদের একটি তালিকা পুলিশ সদর দফতরে এবং অভিবাসন দপ্তরেও পাঠিয়েছি, যাতে তারা পালাতে না পারে। সীমান্ত থেকেও তাদের আটক ও ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
কর্মকর্তারা জানান, ভারত-নেপালের উন্মুক্ত সীমান্ত থাকায় এ ধরনের বন্দিদের দেশ ছেড়ে পালানোর ঝুঁকির কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিভাগটি আরও জানিয়েছে, জেল পালানো কেউ যদি পালিয়ে কোন এলাকায় থাকে, তাহলে স্থানীয় জনসাধারণকে কারা কর্তৃপক্ষকে জানানোর অনুরোধ করা হচ্ছে। একই সাথে গণমাধ্যমের সহায়তায় বন্দিদের বারবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
মহাপরিচালক ন্যুপানে বলছিলেন, ‘প্রতিটি থানাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ সেই অনুযায়ী কাজ করছে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশে একটি অভিযান পরিচালনা করবো, যাতে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের খুঁজে বের করা যায়।’
তবে তিনি এটিও জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র কারাগার থেকে আটকদেরই এই নিরাপত্তা অভিযানে আটক করা হবে না, অন্য অপরাধে অভিযুক্তদেরও আটক করা হবে। এ বিষয়ে সাধারণ জনগণকেও সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
কারা মহাপরিচালক সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেন, ‘জেল পালানো অনেক বন্দিরই আচরণ সংশোধন হয়নি। যে কারণে তারা আরও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।’
একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জানিয়েছে, নেপালের এই জেন জি আন্দোলনের সময় পুলিশ ফাঁড়ি, থানা জেলা সদরে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?
কারা বিভাগের মহাপরিচালক ন্যুপানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৬টি কারাগার থেকে বন্দিরা পালিয়েছে। এর মধ্যে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের সংখ্যা ১৩, ২০৭ জন। আর কিশোর সংশোধনাগারসহ বন্দির সংখ্যা ছিল ৩০, ৪২৯ জন। যার মধ্যে ১৪, ১৭১ জন পালিয়ে গেছে আন্দোলনের সময়। তবে কিছু বন্দি ফিরেও এসেছে, সেই সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৩,০৪০ জন। যার মধ্যে ২,৭৯৬ জন কারাগারে এবং ২৪৪ জন সংশোধনাগারে ফিরেছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র ও ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল বিনোদ ঘিমিরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, কয়েকজন পালিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করলে ভারতীয় পুলিশ তাদের ধরে ফেরত পাঠিয়েছে। আবার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশও কয়েকজনকে আটক করেছে।
ঘিমিরে জানিয়েছেন, কিছু বন্দি নিজেরাই কারাগারে ফিরে এসেছে। তবে পলাতক বন্দিদের খুঁজে বের করার অভিযান চলতে থাকবে।

বিভাগীয় নোটিশে কী আছে?
কারা দপ্তর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। যেখানে বন্দি ও কিশোর আটককৃতদের ফেরার আহ্বানও জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘দেশের বিভিন্ন কারাগার অফিস এবং কিশোর সংশোধনাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়া বন্দি কিংবা কিশোর অপরাধীদের অবিলম্বে তারা যে কারাগার অফিস বা কিশোর সংশোধনাগারে ছিলেন অথবা নিকটস্থ পুলিশ অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
ন্যুপানে বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া বন্দি ও কিশোর অপরাধীদের যদি অন্য জেলায় ধরা পড়ে বা কারো নজরে আসে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারাগারে পাঠানো সম্ভব না হলে তাদের সেই জেলার কারাগারেই রাখা হবে, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
এর আগে আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংশ্লিষ্ট কারাগার অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে এবং যেসব জেলায় কারাগার নেই সেখান থেকে পাঠানো বন্দিদের কাছাকাছি জেলার কারাগার অফিসের সাথে সমন্বয় করে করতে হবে।’
কারা বিভাগ জানিয়েছে, সরকারের অনুরোধ মেনে যারা ফেরত আসবে না তাদের বিরুদ্ধে কারাগার আইন ২০৭৯ এবং প্রচলিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনে কী বলা আছে?
কারাগার আইন ২০৭৯ অনুসারে, যারা কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করবে বা পালাবে তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, কারাগার থেকে পালানো বা পালানোর চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি প্রচলিত আইনে সাজাপ্রাপ্ত এবং প্যারোলে গিয়ে কিংবা কারাগার অথবা কিশোর সংশোধনাগার থেকে পালাবে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।’









