ইরান-ইসরায়েল সাম্প্রতিক সংঘাত এবং ভারতের নীরব অবস্থান নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষনেত্রী সোনিয়া গান্ধী।
এনডিটিভি জানিয়েছে, শুক্রবার ২০ জুন দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি বলেন, ভারতের নীরবতা শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতাই নয়, বরং আমাদের নৈতিক ও কৌশলগত ঐতিহ্য থেকে সরে আসা। সোনিয়া গান্ধী ইসরায়েলের ১৩ জুন ইরানি ভূখণ্ডে চালানো বিমান হামলাকে অবৈধ ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেন।
তিনি লিখেছেন, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ইরানি মাটিতে এসব বোমাবর্ষণ ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। এগুলো শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস ও অতি মাত্রার অভিযানগুলোর মতো এই অভিযানও নিরীহ মানুষের জীবন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়েছে।
তিনি আরও লিখেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছিল। এবছর পাঁচ দফা আলোচনা ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জুনের শেষ দিকে ষষ্ঠ দফা হওয়ার কথা ছিল। আর এমন সময় এই সংঘাত।
সোনিয়া গান্ধী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেন, ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নেতানিয়াহু সেই ঘৃণার আগুন উসকে দিয়েছিলেন যার পরিণতিতে ১৯৯৫ সালে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইজহাক রবিনের হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেই হত্যাকাণ্ড ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে থামিয়ে দেয়।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সমালোচনা করেন, যিনি নিজের গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন উপেক্ষা করে আগ্রাসী কৌশল বেছে নিচ্ছেন। তিনি লেখেন, ইরাক যুদ্ধের মতোই আজ ট্রাম্প সেই একই ভুল করছেন, যা তিনি আগে নিন্দা করেছিলেন।
ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমাদের মধ্যে গভীর সভ্যতাগত সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিপক্ষে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল ইরান। ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে, যা শাহের আমলে পাকিস্তানঘেঁষা নীতির বিপরীতে।
তিনি ২০১৫ সালের যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা ধ্বংস হওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহারের (২০১৮) কারণে ভেঙে পড়ে এবং ভারতের চাবাহার বন্দর প্রকল্প ও উত্তর-দক্ষিণ করিডর প্রকল্পের মতো অর্থনৈতিক স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সোনিয়া গান্ধী ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যেন ভারত তার কূটনৈতিক ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়। গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে তিনি লেখেন, ৫৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পুরো পরিবার, পাড়া এবং হাসপাতাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গাজা আজ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে।
তিনি লেখেন, এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে মোদি সরকার ভারতের ঐতিহ্যগত দুই-রাষ্ট্র সমাধান এবং শান্তিপূর্ণ কূটনীতির নীতিকে বিসর্জন দিয়েছে। গাজা এবং এখন ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে নীরবতা শুধু ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান হারানো নয়, আমাদের নৈতিকতার আত্মসমর্পণও।
সবশেষে তিনি লিখেছেন, এখনও দেরি হয়নি। ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করে মধ্যপ্রাচ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।









