তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন সোহেল রানা। অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধেও। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ষাটের দশক থেকে যত আন্দোলন হয়েছে সবখানে সামনের সারিতে থাকতেন সোহেল রানা।
চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কিংবদন্তী এই চলচ্চিত্র অভিনেতা ‘গণ বিস্ফোরণ’ বলে আখ্যা দিলেন।
তৎকালীন আন্দোলনগুলোর সঙ্গে তুলনা করে সোহেল রানা বললেন, দেশ স্বাধীন একবারই হয়। সেটা ৭১-এ হয়ে গেছে। তখন আমরা জাতি সত্ত্বার জন্য বিদেশী শত্রুর সঙ্গে লড়েছিলাম। কিন্তু দেশের মধ্যে বিপ্লব বার বার হতে পারে। মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ একটা সময় বিস্ফোরণে পরিণত হলে তখনই বিপ্লব ঘটে। আমরা যখন একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলাম পরে রাজপথ থেকে সরে গিয়েছিলাম। আমি যেটা ফিল করি, আমাদের পথটা ছেড়ে দেয়া ঠিক হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম তখন যে সরকার আছে তারা শতভাগ ভালো করবে। কিন্তু আমাদের সেই চিন্তাটা ভুল ছিল।
‘ওরা ১১ জন’ ছবির প্রযোজক বলেন, এবার যে গণবিস্ফোরণ হয়েছে সেক্ষেত্রে আমি বলবো ছাত্রদের বলবো তারা যেন রাজপথ না ছাড়ে। তারা বারবার বলছে, রাজপথ ছাড়ে নাই। এজন্য আমি ওদের সেলুট জানাই। যারা মারা গেছে তাদের জানাই শ্রদ্ধা। আমি ওদের বলবো, যতদিন পর্যন্ত আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন না হবে তোমরা রাজপথ ছেড়ে ভুল করো না। আমি শুরু থেকে তাদের চাওয়ার সঙ্গে একমত ছিলাম। এজন্য তাদের পক্ষে কথা বলায় অনেকে বলেছিল, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কেন ছাত্রদের পক্ষে যাচ্ছি? গিয়েছি কারণ তাদের দাবিটা একদম যৌক্তিক ছিল।
চলচ্চিত্র এবং খেলাধুলায় ‘ক্যারিয়ার রানিং’ থাকাকালীন অনেকে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। সোহেল রানা তাদের কর্মকাণ্ডকে সত্যিকারের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া মনেই করেন না। কাউকে কাউকে তিনি সুযোগ সন্ধানী বলে উল্লেখ করলেন। বিশেষ করে নৌকা প্রতীকে এমপি হিসেবে জয়ী ফেরদৌস ও সাকিব আল হাসানের কড়া সমালোচনা করে সোহেল রানা বলেন, ফেরদৌস, সাকিব আল হাসান কবে আওয়ামী লীগ করলো?
“একটি অনুষ্ঠানে ফেরদৌস সবার সামনে শেখ হাসিনাকে তেল মারলো, ওমনি এমপি হয়ে গেল। সাকিবের কি দরকার ছিল রাজনীতিতে আসার? তার তো কোনোকিছুর অভাব নেই। বরং সে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। আসলে তারা রাজনীতিকে ভালোবেসে এগুলো করেনি, করেছে লোভের কারণে। যেহেতু তারা লোভ সামলাতে পারেনি এখন তো মানুষের পিটুনি খাবেই! যখন ছাত্রদের তাজা প্রাণগুলো চলে যাচ্ছে তখন কয়েকজন বিটিভির সামনে গিয়ে কান্নাকাটি করে শো অফ করা শুরু করেছিল। এটার মানে হচ্ছে তারা প্রতিদানের আশায় এসব করেছে। তাহলে তাদের উপর মানুষ বিরক্ত হবে এটা স্বাভাবিক। চলচ্চিত্রের কোনো শিল্পীই সত্যিকারের রাজনীতি করেনি, যারা জড়িত ছিল আমি তাদের কখনই রাজনৈতিক কর্মী মনে করি না। চলচ্চিত্রে ‘ক্যারিয়ার রানিং’ থাকতে থাকতে কাউকে রাজনীতিতে আসাটা ঠিক বলে আমি মনেও করি না।”
দীর্ঘ আলাপের উঠে আসে চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ। সোহেল রানা বলেন, সেন্সর বোর্ডের কর্তা থাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আমলারা। তারা ঠিকমত চলচ্চিত্র দেখেন না, অথচ সার্টিফিকেটে স্বাক্ষর থাকে। এখানে এই ধরনের কাউকে প্রধান রাখা উচিত না। আর মেম্বার থাকে অধিকাংশই দলীয় লোক। এখানে তো পার্টির সদস্য থাকতে পারবে না এই নিয়ম করা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক, একজন বিনোদন সাংবাদিক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেশ সম্পর্কে জানা বোঝা এমন একজনকে রাখা উচিত। আর স্বাধীন দেশে সেন্সর বোর্ড থাকা মানে পরাধীন করে রাখা। এই নামটা পাল্টে ফিল্ম গ্রেডিং বোর্ড করা যেতে পারে। যদি সেন্সর বোর্ডে কাল থেকে তুলে হয় তারপর থেকে দ্বিগুণ চলচ্চিত্র নির্মিত হবে। আমার মতে, সেন্সর বোর্ড তুলে গ্রেড সিস্টেম করা উচিত। বাচ্চাদের জন্য, মাঝামাঝি বয়সের জন্য, প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য এমন ক্যাটাগরি করে সব ধরনের চলচ্চিত্রের জন্য গ্রেড সিস্টেম থাকা উচিত এবং যে প্রক্রিয়ার চলচ্চিত্রে সেন্সর হয় এটা একেবারে বাদ দেয়া উচিত।”










