অনেকে হয়তো অবাক হবেন—আমার পথটা ডিপ্লোমা থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এখন পিএইচডি। অর্থাৎ, দুই শিবিরের সঙ্গেই আমার পরিচয় আছে। তাই আজকের এই “নবম গ্রেড বনাম দশম গ্রেড” দূর থেকে দেখে কেবল অনেক কিছুই মনে আসে । যেমন তবে সত্যি বলতে, রাজপথে প্রকৌশলীদের এই ভিড় দেখে প্রথমে আমি আশাবাদী হয়েছিলাম। আমার চোখে তখন ভাসছিল উন্নত ও নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন।
ভাবছিলাম, ব্যাচেলর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ভাইদের প্ল্যাকার্ডে হয়তো লেখা থাকবে:
- “শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ২% বাজেট কেন? ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্সে বাজেটের টাকা কোথায়?”
- “বিশ্বের সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের একটিও নেই কেন, জবাব চাই!”
- “গুগল, অ্যাপল, ইন্টেল … আমাদের ক্যাম্পাসে আসে না কেন? আমরা কি শুধু বিদেশে শ্রমিক সাপ্লাই দেওয়ার জন্য ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছি?”
- “দেশে কেন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি নেই? কেন আমরা চিপ ডিজাইন না করে শুধু স্ক্রু লাগানোর অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট বানিয়ে গর্ব করি?”
আর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ভাইয়েরা হয়তো গলা ফাটাচ্ছেন এই বলে:
- “থিওরির বোঝা চাপিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষার গলা টিপে হত্যা করা চলবে না!”
- ”দক্ষ-পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ল্যাব এ্যাসিস্ট্যান্ট নাই কেন!”
- “১৫/২০ বছরের পুরনো ল্যাবের যন্ত্রপাতি দিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের স্বপ্ন দেখানো বন্ধ করুন!”
- “সার্টিফিকেট বিক্রির দোকানস্বরূপ প্রাইভেট পলিটেকনিক সংক্ষিপ্ত করে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে!”
- “ভারতের মতো আমাদেরও কেন যেকোন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসির দ্বিতীয় বর্ষে সরাসরি ভর্তির সুযোগ থাকবে না?”
কিন্তু আমার এই দিবাস্বপ্ন ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। নিউজ দেখে জানলাম, এই মহান আন্দোলনের মূল কারণ শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচানো নয়, বরং আরও অনেক বেশি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়! এই যে শাহবাগে প্রতিবাদের ধোঁয়া আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যন্ত্রপাতির ওপর জমে থাকা ধুলা—এটাই তো আমাদের প্রকৌশল ব্যবস্থার আসল চিত্র বা সার্কিট ডায়াগ্রাম।
আমাদের স্বপ্ন বিশ্বমানের প্রকৌশলী হওয়ার, কিন্তু আমাদের যুদ্ধটা আটকে আছে পদের নাম আর বেতনের ধাপের এক টিনের কৌটোতে। “প্রকৌশলী” শব্দটার ওপর এমন ঐশ্বরিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেন যন্ত্রের মোটরটা ওই নামের জোরেই ঘোরে! এই পদের টানাটানিতে যে পরিমাণ কর্মশক্তি খরচ হলো, তার এক শতাংশও যদি গবেষণাগারের অসিলোস্কোপ, এফপিজিএ বোর্ড অথবা জিপিইউ নোডে যেত, তাহলে আজ চাকরির বাজারে শুধু “ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষক” নয়, মূল প্রকৌশলী পদের জন্যও প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইন দিতে হতো। কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি সহজ পথ: “কোন গ্রেডে কারা ঢুকবে”—এটাই যেন আমাদের জাতীয় উদ্ভাবন!
ডিপ্লোমা শিবিরের ভাইয়েরা হাতে-কলমে দক্ষতাকে সম্মান দেন, কিন্তু একটি ভালো ল্যাভ সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি পাঠ্যক্রম বা শিল্পখাতে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির দাবি তোলার সময় তাদের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে। অন্যদিকে, স্নাতক প্রকৌশলীরা গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং আর উন্নত বিশ্বের মতো ক্যাম্পাস থেকে সরাসরি চাকরিতে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু তারাও রাজপথে নেমে পদের রাজনীতিতে এমন গতি সঞ্চার করেন যে, প্রযুক্তির মূল ভিত্তি থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রম—কোনো কিছুরই আধুনিকায়ন হয় না। এর ফল কী? দেশে “প্রকৌশলী” বাড়ছে, কিন্তু প্রকৌশলের গভীরতা কমছে। দাবির তালিকা লম্বা হচ্ছে, আর গবেষণাগারের যন্ত্রপাতির তালিকা ছোটই থাকছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে এক মিষ্টি ভণ্ডামি। আমরা মুখে “মেধাভিত্তিক নিয়োগ”-এর কথা বলি, কিন্তু দুই পক্ষই নিজ নিজ কোটাকে “ন্যায্য অধিকার” বলে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। যে কোটায় আপনার সুবিধা, সেটার নাম “ন্যায়বিচার”; আর যে কোটায় আপনার প্রবেশাধিকার নেই, তার নাম “অবিচার”!
আসলে দোষটা কী শুধু তাদের? দোষ আমাদের পুরো সিস্টেমের, যা আমাদের শিখিয়েছে— পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য একটাই: একটা সরকারি চাকরি। যেখানে ঝুঁকি নেই, খাটুনি কম, কিন্তু ক্ষমতা আর মাস শেষে নিশ্চিত বেতন আছে। এই সিস্টেম আমাদের উদ্যোক্তা হতে শেখায় না, গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখায় না, নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস জোগায় না। এটি আমাদের একটি আরাম কেদারার জীবন্ত মূর্তি হতে শেখায়।
সবচেয়ে মজার অংশ হলো আমাদের “কমিটি” নামক কারখানা। সমস্যা হলেই একটি কমিটি বসিয়ে দেওয়া হয়, আর আমরা ধরে নিই সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবে যা হয় তা হলো: নকশার ফাইলে মাপমতো স্ক্রু আঁকা হয়, কিন্তু সেটি না লাগলে দোষ দেওয়া হয় যন্ত্রকে। যে দেশে পাঠ্যক্রম ও ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান নেই, সেখানে “পদের নাম কে পাবে” এই আবেগসর্বস্ব লড়াই হলে তার ফল বিপর্যয়কর হওয়াই স্বাভাবিক।
মূল সত্যটা অস্বস্তিকর: আমরা সবাই “নিয়োগের বেতন স্কেল” চাই, কিন্তু “নিয়োগযোগ্য দক্ষতা” অর্জন করতে চাই খুব কম মানুষ। বিশ্বমানের গবেষণা, শিল্পখাতের সাথে সংযোগ, বা নতুন পণ্য তৈরির সংস্কৃতি—এসবের কথায় আমরা হাততালি দেই; কিন্তু বাজেট, গবেষণাগার বা পাঠ্যক্রম সংস্কারের প্রসঙ্গ এলেই আমাদের কলমের কালি ফুরিয়ে যায়।
এই অচলাবস্থা থেকে বের হতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:









