ক’দিন আগেই শ্রীমঙ্গলে ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়া একটি হিমালয়ান গৃধিনী শকুন বা গিন্নি জাতের শকুন উদ্ধার করেছে শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। সিন্দুরখাঁন চা-বাগান এলাকা থেকে শকুনটিকে উদ্ধার করেন বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল।
তিনি জানান, অতিরিক্ত ঠান্ডায় শকুনটি অসুস্থ হয়ে ধান ক্ষেতে নেমে আসে। গ্রামের শিশুরা শকুনটির সাথে খেলছিল, তখন একজন সিএনজি চালক বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে খবর দেয়। খবর পেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই এলাকা থেকে শকুনটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়।
সজল দেব জানান, উদ্ধার করা শকুনটি হিমালয়ান গৃধিনী প্রজাতির শকুন। শকুনটির পুরো শরীর ঠান্ডায় জমে গিয়েছিল। সেবা ফাউন্ডেশনে এনে আগুন জ্বালিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং খাবার দেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে প্রাণীটি সুস্থ হয়ে ওঠে। আহত শকুনটি সুস্থ হলে বনবিভাগে হস্তান্তর করা হয়।
শ্রীমঙ্গলে ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’ যা ‘সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামে খুব জনপ্রিয় ও শিশুদের জন্য আকর্ষণীয়! এই সেবাশ্রমটি শ্রীমঙ্গলের রুপসপুর এলাকায় হাইল হাওরের কাছাকাছি ১.৮০ একর এলাকাজুড়ে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার।
পর্যটন শহর শ্রীমঙ্গলে এই বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন গড়ে ওঠায় দেশ-বিদেশের পর্যটক প্রচুর দর্শনার্থী বেড়াতে আসেন এখানে। ফাউন্ডেশনটি বর্তমানে পরিচালনা করেন বন্যপ্রাণী সেবক সিতেশ রঞ্জন দেবের সন্তান স্বপন দেব সজল।
এখানে মুখপোড়া ও চশমা পড়া হনুমান, লজ্জাবতী বানর, বিলুপ্ত প্রজাতির শকুন, সাপ, পাখিসহ দুই শতাধিক দুর্লভ প্রজাতির বন্যপ্রাণী চিকিৎসা সেবা পেয়ে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। আর এসব প্রাণী দেখতে প্রতিদিন ভীড় করেন দর্শনার্থীরা। এই সেবাশ্রমে ঠাঁই হয় নানা প্রজাতির অসুস্থ বা আহত বন্যপ্রাণীর। আবার সেসব প্রাণীর বেশিরভাগকেই সুস্থ্য করে অবমুক্ত করা হয় লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্ট বা আশেপাশের মুক্ত এলাকায়।
এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সেবক সিতেশ রঞ্জন দেব, যিনি নিজেই একসময় ছিলেন শিকারী।
জানা যায়, এক সময়কার দুর্দান্ত শিকারি সিতেশ রঞ্জন দেব। পশুপাখির সেবা আশ্রম হিসেবে এর গোড়াপত্তন করেছিলেন তার বাবা শ্রীশ চন্দ্র দেব। দুরন্ত বালক সিতেশ বাবার নেশা তথা পশুপাখির প্রতি ভালোবাসার অভ্যাস পেয়েছেন। বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেও যে কখন জীবজন্তুপ্রেমী হয়ে গেছেন, টেরই পাননি। শিকার করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বহুবার। এর ছাপ আছে তার শরীরে। আছে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর গল্প!
১৯৯১ সালে কমলগঞ্জের পত্রখোলা চা-বাগানে বন্য শূকরের উপদ্রব বেড়ে যায়। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ সিতেশ বাবুর শরণাপন্ন হন। বাগানে সারারাত দুইনলা বন্দুক দিয়ে শিকার করেন সিতেশ বাবু। শিকার চলাকালে প্রায় আট ফুট লম্বা একটি ভাল্লুকের সামনে পড়েন তিনি। বন্য ভাল্লুকের থাবায় তার ডান চোখসহ গালের অনেকটা হারিয়ে যায়। টানা দুই মাস চলে চিকিৎসা। সুস্থ হলেও চেহারায় সেই ভয়াল থাবার ছাপ এখনো রয়ে গেছে।
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সীমানায় ঢুকতেই শোনা যায়, পাখির কিচিরমিচির! বিরল প্রজাতির এই পাখিগুলো দেখে যে কেউই অবাক হবেন। সিতেশ বাবুর সেবাশ্রমে রয়েছে জংলী রাজহাঁস, চখা, সরলী, রাজ সরলী, চা পাখি, ধনেশ, হরিয়াল, সবুজ ঘুঘু, বনমোরগ, ডাহুক, জল কবুতর, নীল গলা বসন্ত বৌরি, তিলা ঘুঘু ও তিতির , ময়না, টিয়া, তোতা, পাহাড়ি বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।
সেবাশ্রমে ঢুকেই চোখে পড়বে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন দেয়ালচিত্র, পাশেই রয়েছে বিরল প্রজাতির হনুমান। আরো আছে বানর, শকুন, সাদা বক, সোনালি রঙের কচ্ছপ, অজগর, বিষাক্ত শঙ্খিনী সাপ, মেছো বাঘ, গুঁইসাপ। তারাও বংশবিস্তারও করছে।
সিতেশ বাবুর সেবাশ্রমের আরেক আকর্ষণ কাঠবিড়ালী। নিতান্ত নিরীহ গোছের এই প্রাণীটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ডানা মেলে উড়ে যেতে পারে! উড়ন্ত অবস্থায় এদের শরীরের চামড়া ছড়িয়ে পড়ে ডানার আকৃতি নিয়ে। এছাড়া চিড়িয়াখানায় আছে মায়া হরিণের দল। মায়া হরিণের পরেই রয়েছে ভাল্লুকের খাঁচা। এক কোনে রয়েছে অজগরের অবস্থান যেখানে রয়েছে এক জোড়া অজগর। এই অজগরগুলো একসময় এখানেই ৩৮টি ডিম পেড়েছিল। সে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেছিল যেগুলোকে পরবর্তীতে লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়।
এছাড়াও সিতেশ বাবুর সেবাশ্রমে রয়েছে পুরু শরীর জোড়া কাঁটা আবৃত সজারু, হিমালয়ান পাম্প সিভিট ও লম্বা লেজওয়ালা হনুমান।
শ্রীমঙ্গলে শীত বেড়েছে। এই শীতে বন্যপ্রাণীদের জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
সজল দেব জানান, ‘রাতে ভাল্লুকের খাঁচার পাশে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয় দীর্ঘসময়। অন্যান্য প্রাণীদের দেয়া হয় কম্বল, চট ইত্যাদি। শীতের প্রকোপ বাড়লে তারা চট বা কম্বলের মধ্যে নিজেরাই ঢুকে যায়, আবৃত করে রাখে নিজেদের। আর সেবাকর্মীরা দেখাশোনা করছেন সর্বক্ষণ।’









