মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নের যে দীপশিখা প্রজ্বালিত করেছিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ, তা আজও আলোকিত করছে বিশ্বের কোটি মানুষের জীবন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (২০ ডিসেম্বর)।
২০১৯ সালের এই দিনে ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সমাজসেবায় অসামান্য ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২৫ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তখন দেশের অর্থনীতি ছিল চরমভাবে বিপর্যস্ত। ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থীদের সহায়তায় তিনি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম এলাকা সুনামগঞ্জের শাল্লায় প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাক। মানবসেবার সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এক উন্নয়ন মডেলে পরিণত হয়েছে।
১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণকারী স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৬২ সালে লন্ডন থেকে কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট ডিগ্রি অর্জন করেন। পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানিতে সিনিয়র কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর তিনি চাকরি ছেড়ে লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ ও ‘হেলপ বাংলাদেশ’ গড়ে তুলে যুদ্ধাহত ও শরণার্থীদের সহায়তায় কাজ করেন।
স্বাধীনতার পর ৩৬ বছর বয়সে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের সূচনা করেন। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন ছিল তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার, অভিবাসন, নগর উন্নয়নসহ বহুমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে ব্র্যাক একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলে।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার ১৪টি দেশে ব্র্যাকের কার্যক্রম পৌঁছেছে প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কাছে। কাজের উদ্ভাবনী ও টেকসই প্রভাবের স্বীকৃতিস্বরূপ জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ‘এনজিও অ্যাডভাইজার’ ২০২০ সালে টানা পঞ্চমবারের মতো ব্র্যাককে বিশ্বের শীর্ষ এনজিও হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সমাজসেবা ও মানব উন্নয়নে অবদানের জন্য স্যার ফজলে হাসান আবেদ দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে রামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ, লেগো অ্যাওয়ার্ড, ইদান প্রাইজ, ওপেন সোসাইটি প্রাইজ এবং ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অ্যাওয়ার্ড। ২০০৯ সালে ব্রিটিশ ক্রাউন তাঁকে ‘দ্য মোস্ট ডিস্টিংগুইশড অর্ডার অব সেন্ট মাইকেল অ্যান্ড সেন্ট জর্জ’ উপাধিতে ভূষিত করে।
তিনি প্রিন্সটন, অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন। দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন চিন্তাধারায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
মানবিকতা, উদ্ভাবন ও আত্মমর্যাদাভিত্তিক উন্নয়নের যে দর্শন স্যার ফজলে হাসান আবেদ রেখে গেছেন, তা আজও বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অসংখ্য উন্নয়নকর্মী ও প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।









