ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির মধ্যেই উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকার আশপাশে ঘনবসতি, উঁচু ভবন ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে ফ্লাইট সেফটি হুমকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন করে নির্মিত অন্তত ছয়টি ভবনের কারণে দেখা দিয়েছে এই নিরাপত্তা ঝুঁকি।
সম্প্রতি ভারতের আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং-৭৮৭ দুর্ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (আইকাও) আইন মেনে বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরের আশেপাশে ‘মুক্ত আকাশ’ (ক্লিয়ার জোন) নিশ্চিতের জোর দাবি উঠেছে। এমন আবহে শাহজালাল বিমানবন্দরের ওই তৃতীয় টার্মিনাল ঘিরে বেড়েছে উড্ডয়ন ঝুঁকি।
এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার দিয়াবাড়ির পাশে এসব বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে প্রিয়াঙ্কা সিটি হাউজিং প্রকল্প। এরই মধ্যে রাজউকের (অঞ্চল-১) কাছে দেওয়া চিঠিতে বেবিচক ‘অনুনোমদিত’ ভবন ছয়টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। তবে রাজউক ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যে কমিটি গঠন করেই দায় সেরেছে। দৃশ্যত, এ কমিটি এখনো কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ মনজুর কবির ভূঁইয়া চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘এই ধরনের গড়িমসি সহ্য করা যায় না। “দোষী ভবনগুলোর” বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট বেবিচক-এর পক্ষ থেকে রাজউক’কে ওই বিষয়ে “জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণে” বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেবিচক, রাজউক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের প্রতিনিধি নিয়ে গঠত ছয় সদস্যে কমিটি এ বছর জানুয়ারিতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে সমস্যা রয়ে গেছে একই তিমিরে।
বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে রাজউককে জানিয়েছি। এখন পদক্ষেপ নেওয়া তাদের দায়িত্ব। বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই।’
রাজউকের পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারির জেরে পলাতক থাকায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চল-১-এর পরিচালক মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওই বিষয়ে ওয়াকিবহাল রাজউকের প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবিল আয়াম জানান, তদন্ত কমিটি কাজ শেষ করে বেবিচককে জবাব দিয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজউকের পরিদর্শক বাদল হোসেন জানান, ‘উত্তরা আগে অঞ্চল-৩ এর অধীনে ছিল, যা গত বছর ১ আগস্টে অঞ্চল-১ এ অধিভূক্ত হয়।’
তিনি বলেন, ‘সন্দেহজনক ছয়টি ভবনের বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তবে রাজউকের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশনা আসেনি।’
বেবিচক চিঠিতে প্রিয়াঙ্কা সিটি হাউজিং-এর ছয়টি প্লটে যে ভবনগুলোকে অভিযুক্ত করেছে, সেগুলোর উচ্চতা যথাক্রমে– প্লট ২৬: ৭ তলা (৮০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৩৫ ফুট), প্লট ৯: ৭ তলা (৮০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৩৬ ফুট), প্লট ১৩: ৮ তলা (৯০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৪৬ ফুট), প্লট ৩০: ৮ তলা (৯০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৪৪ ফুট), প্লট ৩৬: ৮ তলা (৯০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৫৬ ফুট), প্লট ৫১: ১০ তলা (১১০ ফুট উঁচু, অনুমোদিত ৭৩ ফুট)।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। তবে এ বছরের শেষ নাগাদ এটি পুরোদমে চালু হওয়ার কথা। পুরো প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায় ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর। এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি’র (জাইকা) কাছ থেকে ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে। আর বাকি পাঁচ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় তৃতীয় টার্মিনাল নির্মানের কাজ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে দৈনিক ফ্লাইট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে রানওয়ে ব্যবহারও বাড়বে, বাড়বে রাতের ফ্লাইট। কিন্তু রানওয়ের অ্যাপ্রোচ ও টেকঅফ জোনের কাছাকাছি এলাকায় যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “তৃতীয় টার্মিনাল চালু মানে শুধু যাত্রীসেবা বাড়ানো নয়, বরং আকাশপথের ঝুঁকিও বাড়বে। রানওয়ের ক্লিয়ার জোনে যদি অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে যায়, তাহলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অবস্টাক্যাল লিমিটেশন সারফেস (ওএলএস) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের চারপাশে অনেক ভবন এই সীমা অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে শঙ্কা
২০২৫ সালের ১২ জুনে ভারতের আহমেদাবাদে ভয়াবহ এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনায় আড়াইশ জনের প্রাণহানির পর দেশটি সিভিল এভিয়েশনের মহাপরিচালক নতুন বিধিমালা ঘোষণা করেন। এর আওতায় উচ্চতা লঙ্ঘনকারী ভবন ভাঙার নিয়মসহ জারি করা হয় ‘এয়ারক্রাফট (ডেমোলিশন অব অবস্ট্রাকশন) রুলস, ২০২৫’।
বিশ্বজুড়ে বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিমানবন্দরের আশপাশে উঁচু ভবন থাকলে তা উড্ডয়ন ও অবতরণে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ কারণে মুক্ত আকাশের (ক্লিয়ার জোন) ওপর তারা জোর দিয়েছেন।
মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি (এফএএ), ব্রিটেনের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (সিএএ) সহ বিভিন্ন দেশের বেসারিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তাদের আঞ্চলিক আইন বা জোনিং ল’ পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে।









