রাখাইন রাজ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। এ যেন রোহিঙ্গা জেনোসাইডের সেকেন্ড ওয়েভ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর রাখাইন রাজ্যে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা এবারের নিধনযজ্ঞর নির্মম শিকার। বেশিরভাগ রোহিঙ্গা মাতৃভূমি ছাড়তে মরিয়া।
পাশার দান উল্টে গেছে এবার। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জায়গায় আরাকান আর্মি, বাকিটা ইতিহাসের আশ্চর্য পুনরাবৃত্তি! ২০১৭ এবং ২০২৩-২৪-এ নিপীড়নের সব অনুষঙ্গ এক। গত বছর অপারেশন ১০২৭ শুরুর পর বুথিডং ও মংডুর অবস্থাপন্ন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সীমান্তে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের পাড়ি জমায়। এবার দরিদ্র রোহিঙ্গা জনস্রোত বাংলাদেশমুখী। ভাগ্যের কি আশ্চর্য পরিণতি! একই নৌকায় রোহিঙ্গা ও তাদের বিতাড়ণকারী করা জান্তাবাহিনী আজ বাঁচার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী। আন্তর্জাতিক আইন মেনে মিয়ানমারের সেই সেনাদের আশ্রয় দিয়ে, যথা সম্মানপূর্বক নেপিদোর কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ।
অপারেশন ১০২৭-এর প্রেক্ষাপটে আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো। চাঁদাবাজি, নির্যাতন, জোরপূর্বক বাহিনীতে প্রবেশে বাধ্য করা, নারী নিপীড়নসহ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রোহিঙ্গারা। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অস্ত্রধারী হচ্ছে রোহিঙ্গারা। তবে হায়, কে যে লাঠি হয়ে ঘোরে!
অপারেশন ১০২৭: অগ্নিঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গারা
রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরাকান আর্মি অভিযান পরিচালনার সুবিধার্থে প্রথমে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়ে নিরীহ ও নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। জান্তা বাহিনী গ্রামগুলোতে হামলা চালালে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। বুথিডং, মংডু এবং রাথেডং এলাকায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়েছে এবং মানবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন কি আশ্রয়কেন্দ্রেও রোহিঙ্গারা নিরাপদ নয়, সিটুওয়েতে জান্তার গোলাবর্ষণে আটজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু এবং নারী ছিলেন, যারা সামরিক সরকার নিয়ন্ত্রিত সিটুওয়ের অভ্যন্তরীণ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আরাকান আর্মি হেফাজতে রোহিঙ্গা হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। বেশিরভাগই মারা যাচ্ছে গৃহহীন হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে গিয়ে। খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক চাহিদা বঞ্চিত লাখ লাখ মানুষ।
পড়শির বাড়িতে আগুন, আঁচ বাংলাদেশেও
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। ক্যাম্পে অবস্থানরত বেশিরভাগ তরুণ রোহিঙ্গা জান্তা সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করতে রাখাইন রাজ্যে পালিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মোট ৬৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৮টি ঘটনা উখিয়া ক্যাম্পে এবং ৮টি টেকনাফ ক্যাম্পে ঘটেছে। বিভিন্ন সংঘর্ষে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। র্যাব এবং এপিবিএন-এর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে ৪৯১ রাউন্ড বুলেটসহ একটি অত্যাধুনিক এম১৬ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। বন্দুক এবং প্রচুর গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়েছে। বুথিডং ও মংডুর পরিত্যক্ত গ্যারিসনগুলো থেকে জান্তা সেনাবাহিনীর ফেলা যাওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করছে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী একটি জনগোষ্ঠীর এভাবে ঢালাও সশস্ত্র হয়ে ওঠাটা বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
জান্তাবাহিনীতে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ: একটি গভীর বিশ্লেষণ
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জান্তাবাহিনীর নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের পর, অপারেশন ১০২৭-এর প্রেক্ষাপটে তাদের এই বিপ্রতীপ অবস্থান অনেক বিশ্লেষককেই বিস্মিত করেছে। এর নেপথ্য কারণগুলো হলো–
রোহিঙ্গা-রাখাইন ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব: মুসলিম রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমারের বাঙালি’ মনে করে রাখাইনরা। আরাকান আর্মির পতাকায় ৭টি তারকা ৭টি জনগোষ্ঠীর প্রতীক, এদের মধ্যে রোহিঙ্গা নেই। আরাকান আর্মি মূলত রাখাইন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে। আরাকান আর্মির সাথে দরকষাকষি করতে জান্তাবাহিনীর পরগাছা হিসেবে মাথা তোলার চেষ্টা করছে বহু গ্রুপে বিভক্ত রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তি: মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের জোরপূর্বক তাদের বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। মাতৃভূমিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রোহিঙ্গাদের অস্ত্র প্রয়োজন, জান্তাবাহিনীতে যোগ দেয়াই এ ক্ষেত্রে অস্ত্রপ্রাপ্তির সহজতম উপায়।
নাগরিকত্বের প্রলোভন: জান্তাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করছে।
রোহিঙ্গা সমর্থনে গ্রহণযোগ্যতা পাবে আরাকান আর্মি
এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, রাখাইন অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গাদের সমর্থন আদায় করতে হবে আরাকান আর্মিকে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে তাদের ওপর। আস্থা অর্জনই হবে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কিছু নেতা এবং সদস্যরা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে তাদের গ্রামগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে এবং আরাকান আর্মিকে সহায়তা করছে। তবে আরাকান আর্মির সামরিক কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও AA এর প্রতি আস্থাহীন এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য AA এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।
এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জনের জন্য আরাকান আর্মি (AA) কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। প্রথমত, AA কে রোহিঙ্গাদের প্রতি শত্রুতা এবং নির্যাতনের অতীত কার্যক্রম থেকে সরে আসতে হবে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর AA রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার ও তাদের পুনর্বাসনের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছিল। এ ধরনের নীতিগত অবস্থান বজায় রেখে রোহিঙ্গাদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, AA এর রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ULA) কে রোহিঙ্গাদের প্রশাসনিক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দিতে হবে। স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়ে রোহিঙ্গাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, AA এর উচিত রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো ধরনের সহিংসতা থেকে বিরত থাকা এবং তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা করে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনে সহায়তা করতে হবে। এছাড়াও, AA কে তাদের সামরিক কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের সাথে একটি বিশ্বাসভাজন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এভাবে তারা রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জন করতে পারে এবং একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে পারবে।
উপসংহার
অপারেশন ১০২৭-এর ফলে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। একদিকে কিছু রোহিঙ্গা জান্তাবাহিনীর সাথে যোগদান করে সুরক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে কিছু রোহিঙ্গা আরাকান আর্মির সঙ্গে থেকে স্বায়ত্তশাসিত আরাকানের স্বপ্নে সামিল হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। জান্তাবিরোধী এই সর্বাত্মক লড়াইয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে না নেয়াটা আরাকান আর্মির একটি বড় কৌশলগত ভুল। এই জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে আরাকান অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এখনও সময় আছে, আরাকান আর্মির উচিত রোহিঙ্গা নেতৃত্বের সাথে আলোচনায় বসা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








