আমার মায়ের লাশ যখন মর্গে, তখন আমার ছয় বছরের ছেলে আইসিইউতে। পুলিশের গুলি মাথা ভেদ করে বের হয়ে যাওয়া ছেলেকে নিয়ে আইসিউতে থাকায় আমি আমার মায়ের লাশের সাথে গ্রামে যেতে পারিনি।
চব্বিশের জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দিতে একথা বলেন অলৌকিক ভাবে বেচে যাওয়া ছয় বছর বয়সী মুসার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনাল-১ এ চলা এই মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে মোস্তাফিজুর তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির ব্যবসা করি। আমার একটি দোকান আছে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকাল আনুমানিক ৩ টার সময় আমার বাবাকে খাবার পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার ৬ বছর বয়সী ছেলে মো: বাসিত খান মুসা আইসক্রীম খেতে চায়। তখন আমি আমার মা ও আমার ছেলেকে নিয়ে বাসার নিচে নামি। মাকে বলি আইসক্রীম কিনে দেওয়ার পর আমার ছেলেকে নিয়ে বাসায় চলে যেতে। কিন্তু বাসার নিচে নামার পর গেইটের বাহির থেকে পুলিশের ছোঁড়া একটি গুলি আমার ছেলের মাথায় লেগে মাথা ভেদ করে পেছন দিয়ে দিয়ে বের হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আমি আমার ছেলেকে কোলে করে পাশ্ববর্তী ফেমাস হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমার বাসা থেকে আনুমানিক ৭০ ফিট দুরে রামপুরা থানা ভবন অবস্থিত। আমি আমার বাসার গেইট থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম ঐ থানার ওসি মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্য সরাসরি গুলি করছিলো। ফেমাস হাসপাতালের ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত আমার ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললে আমি এ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওইদিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৭ টার দিকে আমরা হাসপাতালে পৌছাই। ফোন করলে আমার বাবা ও স্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসে। আমার ছেলের মাথায় ডাক্তাররা অপারেশন করে। তখন আমি আমার মাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাকে বার বার ফোন করেও পাইনি। পরবর্তীতে আমার এক প্রতিবেশীকে ফোন করে আমার ফ্লাটে গিয়ে আমার মায়ের খোঁজ করতে বলি। তিনি আমাকে জানান যে, আমার ছেলের মাথায় যে গুলিটি লেগেছিলো সেই গুলিটি আমার ছেলের মাথা ভেদ করে আমার মায়ের পেটে লেগেছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে আমার ছেলেকে নিয়ে আসায় মায়ের গুলি লাগার বিষয়টি জানতে পারিনি। প্রতিবেশী আমাকে আরো জানান, তারা আমার মাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফরাজি হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। আমি যেন আমার কোন আত্মীয়কে আমার মায়ের কাছে ফরাজী হাসপাতালে পাঠাই। আমার স্ত্রী বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই আমার মাকে প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কারণে আমার স্ত্রী আমার মায়ের গুলি লাগার সংবাদ তখন জানতে পারেনি।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে মোস্তাফিজুর বলেন, বাইরে অনেক গুলাগুলি হওয়ার কারনে আমরা কেউ ঢাকা মেডিকেল থেকে বের হয়ে ফরাজী হাসপাতালে যেতে পারছিলাম না। আমি আমার এক আত্মীয়কে ফোন করে দ্রুত ফরাজী হাসপাতালে যেতে বলি এবং তিনি ফরাজী হাসপাতালে গিয়ে দেখেন যে, আমার মা ফরাজী হাসপাতালে অবস্থায় আছেন। ডাক্তাররা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু গাড়ি না পাওয়ায় তিনি আমার মাকে ঢাকা মেডিকেলে আনতে পারেননি। বাইরে তখন অনেক গোলাগুলি হচ্ছিলএকপর্যায়ে ঐ দিন রাত ১১ টার দিকে আমি আমার বাবাকে ফরাজী হাসপাতালে পাঠাই। রাতে এ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় বাবাও মাকে ঢাকা মেডিকেলে আনতে পারেনি। পরদিন সকাল ৫ টার দিকে আমি ঢাকা মেডিকেল থেকে একটি এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ফরাজী হাসপাতালে পাঠাই। ঐ এ্যাম্বুলেন্সে করে বাবা মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। পথিমধ্যে মায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে নামানোর পর ডাক্তাররা মায়ের ইসিজি করেন এবং তাকে মৃত ঘোষণা করেন। (এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন)। আমার মায়ের লাশ যখন মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমার ছেলে আইসিইউতে ছিলো। আমি আমার মায়ের লাশ নিতে চাইলে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ জানায়, যেহেতু সে রামপুরা থানা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তাই লাশ নিতে হলে রামপুরা থানা পুলিশের অনুমতি লাগবে। আমি রামপুরা থানার ওসির মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে তাকে ফোন করে তাকে অনুরোধ করি যে থানা থেকে একজন পুলিশ সদস্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠাতে। ২০ জুলাই দুপুরে আমি ঢাকা মেডিকেল থেকে একজনকে মোটর সাইকেলসহ রামপুরা থানায় পাঠালে দুজন সাব-ইন্সপেক্টর সিভিল পোশাকে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। তারা বলেন যেহেতু লাশটি গুলিবিদ্ধ তাই লাশটি এখন দেওয়া যাবে না। অনেক অনুরোধের পরও তারা লাশ দিতে রাজি হয়নি। পরবর্তীতে তারা এই শর্তে রাজি হয় যে, লাশ নিয়ে রামপুরায় যাওয়া যাবে না। তাদের কথামতো আমার বাবা লাশ নিয়ে টাংগাইলের মির্জাপুর থানায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করেন। আমার ছেলে আইসিউতে থাকায় আমি আমার মায়ের লাশের সাথে যেতে পারিনি।
জবানবন্দিতে মোস্তাফিজুর বলেন, আমার ছেলে ২৬ তারিখ পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি ছিলো। এরপর তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি ছিলো। তার অবস্থার অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকেরা তাকে সিংগাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর পরামর্শ দেয়। পরবর্তীতে চ্যানেল আই এয়ার এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেয়। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত আমার ছেলে সিংগাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তার সকল চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করেন। সিংগাপুর থেকে তাকে আবার সিএমএইচে অবজারবেশনে রাখা হয়। গত ৯ জুলাই তাকে পুনরায় সিংগাপুরে নেওয়া হয়। গত ২৬ জুলাই পর্যন্ত সিংগাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।সিংগাপুর থেকে আনা খাবার আমার ছেলে এনজিটিউবের মাধ্যমে নাক দিয়ে গ্রহণ করে। আমার ছেলের ডানদিক এখন প্যারালাইজড। সে কথাও বলতে পারে না। চলাফেরাও করতে পারে না। তাকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে আনলে তার মাথায় গুলির ক্ষতচিহ্ন এবং চিকিৎসার সরঞ্জামাদি দেখা যায়।
সাক্ষী হয়ে মোস্তাফিজুর তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি রামপুরা থানার ওসিকে সরাসরি অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখেছি। সেখানে আরো অনেক পুলিশ ছিলো। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি সেখানে চঞ্চল নামে একজন পুলিশ ছিলো। আমার মায়ের হত্যা এবং আমার সন্তানের এই অবস্থা করার জন্য যারা দায়ী আমি তাদের বিচার চাই। (এ পর্যায়ে সাক্ষী পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন)।
আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মোস্তাফিজুরকে জেরা করেন পলাতক তিন আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন ও গ্রেপ্তার চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, সুলতান মাহমুদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী সোমবার দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।









