সংস্কৃতিসাধক, ভাষা সৈনিক ও ছায়ানটের সভাপতি বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী অধ্যাপক সন্জীদা খাতুনের ৯০তম জন্মবার্ষিকী মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল)। তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে এদিন সকালে ‘নবতিপূর্ণা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তারই হাতে গড়া সংগঠন ছায়ানট। সশরীরে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন সংস্কৃতিসাধক সন্জীদা খাতুন। উপভোগ করেন নৃত্য, সংগীত ও আবৃত্তি। তাকে নিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি সারওয়ার আলী।
৯০ তম জন্মদিন উদযাপন লগ্নে সবশেষে সন্জীদা খাতুনও একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। যেখানে জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব। চ্যানেল আই অনলাইন পাঠকদের জন্য সন্জীদা খাতুনের বক্তব্যটি হুবুহু তুলে ধরা হলো:

আমার জীবনের নব্বইটি বছর পার হয়ে গেল। আজ ভাবতে বসেছি, জীবনটাকে আমি কী রকম করে সাজাতে চেয়েছিলাম আর বাস্তবে কী হয়েছে।
ছেলেবেলায় ইজিচেয়ারের বাতিল হয়ে যাওয়া কাপড় বিছিয়ে নানীর দেখাদেখি নামাজের ভঙ্গি করতাম। আর কিছুই জানা ছিল না বলে মুখে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলতে থাকতাম। মোনাজাতে অনেক কিছু চাইতাম আল্লাহর কাছে। কিছুদিন পরেই মনে ধিক্কার এলো নিজের জন্যে এটা ওটা চাইব কেন? ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে অন্য সবার মঙ্গল কামনায় মোনাজাত করতে আরম্ভ করলাম। সেই থেকেই সবার ভালো চাইবার দিকে মন গেল।
আমার মা ভিখারিকে কিছু দেবার কাজটি আমাদের দিয়ে করাতেন। বলতেন, তাতে গরিব মানুষদের প্রতি আমাদের মনে মায়ামমতা জন্মাবে। এ শিক্ষা মানুষকে ভালোবাসবার মানসিকতা গড়ে দিয়েছিল বাল্যকাল থেকে।
গানের সুর আর ছন্দ আমাকে আবাল্য মোহিত করেছে। শেষ বিকেলে দক্ষিণের বারান্দায় পাটি পেতে বড়দি গান গাইতে বসতেন। নানা ধরনের গান। আমার আকর্ষণ ছিল একটি গানে, ‘তৃষ্ণার জল এসো এসো হে’। অপেক্ষা করতাম বড়দি কতক্ষণে গাইবেন- ‘এসো এসো হে তৃষ্ণার জল, কলকল্ ছলছল্ / ভেদ করো কঠিনের ক্রুর বক্ষতল কলকল্ ছলছল্। এসো এসো উৎসস্রোতে গূঢ় অন্ধকার হতে এসো হে নির্মল কলকল্ ছলছল্।’ এ আকর্ষণ ছিল দুর্বার।
বছর পাঁচেক বয়সে বড়দির ওস্তাদজি প্রসিদ্ধ ঠুমরি গায়ক মহম্মদ হোসেন দাদুর কাছে গানের হাতেখড়ি হয়েছিল। ক্রমে গান শিখলাম, গাইলাম। রেডিওতে, পরে টেলিভিশনে। তারপর ছায়ানটের ‘শ্রোতার আসর’ করতে গিয়ে দেশে সংগীতশিল্পীর অভাব টের পেলাম। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ‘ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন’ শুরু হলে, তার সঙ্গে যুক্ত হলাম। গানের শিক্ষা, সাধনা আর প্রসারের কাজে আগাপাশতলা সম্পৃক্ত হয়ে গেলাম। এ আন্দোলনের আনন্দ জীবনের সব চাওয়া-পাওয়াকে ছাড়িয়ে গেল। এই ধারাতেই আরো একটি আন্দোলনের সূত্রপাত হলো কিছুকাল পরে ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ্’-এর অন্তত ত্রিশ/পঁয়ত্রিশটি শাখায় ঘুরে ঘুরে, কখনো-বা ঢাকাতে শাখা প্রতিনিধিদের ডেকে এনে সংগীতশিক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। এতে সংগীতের সম্প্রসারণ ঝটিকাগতি পেল।
২০০১ অর্থাৎ ১৪০৮ সালের পয়লা বৈশাখে বটমূলে বোমা হামলার পর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সুফল নিয়ে আমাদের আত্মসন্তোষ বিরাট ধাক্কা খেল। বোঝা গেল, পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ে তুলবার উপযোগী শিক্ষার অভাব অতি প্রকট। তখন আঁকা-গড়া, নাচ-গান, আবৃত্তি-অভিনয়ের আনন্দময় শিক্ষার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করবার নতুন আন্দোলন দানা বাঁধে। সর্বাঙ্গসুন্দর শিশুশিক্ষার কাজে প্রতিষ্ঠা করা গেল ‘নালন্দা’ বিদ্যালয়।
সেই-যে ছেলেবেলায় সবার মঙ্গলসাধনের ইচ্ছা তা পূর্ণ হতে পেরেছে এইভাবে। শিশুদের জন্যে, দেশের জন্যে বাঙালি জাতির জন্যে কাজ করে আমার জীবনটা অর্থবহ হয়েছে বলে মনে করি। অল্পে তুষ্ট সহজ-সরল জীবনের এই সার্থকতায় আমি ধন্য হয়েছি।







