দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫’ জারি করেছে। এই আরপিও নির্বাচনি ব্যবস্থায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছে সরকার। এরআগে গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়।
নতুন এই আইনে জোট করেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার বাধ্যবাধকতা, ফেরারি আসামির প্রার্থিতা নিষিদ্ধ, ‘না ভোট’ ফেরানো, এআই ও গুজবের অপব্যবহারকে অপরাধ ঘোষণা, সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ফিরিয়ে আনা, ব্যয়ের সীমা ও স্বচ্ছতার কড়াকড়ি। সব মিলিয়ে এবার নির্বাচনের রূপ ও নিয়ম দুটোই বদলে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, এই সংস্কারগুলো ভোটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে; তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, এটি একই সঙ্গে নতুন সুযোগ ও নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা করছে।
জোট করলেও ভোট হবে নিজ দলের প্রতীকে
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, জোটগত নির্বাচনেও প্রতীক ভাগাভাগি করা যাবে না। অর্থাৎ একাধিক নিবন্ধিত দল একসঙ্গে জোট করলেও প্রতিটি দলকে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে। আগে বড় দলের প্রতীকে ছোট দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দিত; এবার তা বন্ধ হচ্ছে।
বিএনপিসহ কিছু দল এই ধারার বিরোধিতা করলেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সংশোধন বহাল রাখার দাবি তুলেছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোট রাজনীতির চিত্র বদলে যেতে পারে।
ফেরারি আসামি প্রার্থী হতে পারবেন না
নতুন আরপিও অনুযায়ী আদালত ঘোষিত ‘ফেরারি বা পলাতক আসামি’ প্রার্থী হতে পারবেন না। আগে শুধুমাত্র সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে অযোগ্যতা থাকলেও এবার তা প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আইনি ঝামেলায় থাকা অনেক রাজনীতিকের প্রার্থিতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিবাদের ভাষা ‘না ভোট’ ফিরছে আবার
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বাদ পড়া ‘না ভোট’ এবার আবার ফিরে আসছে। কোনো আসনে একমাত্র প্রার্থী থাকলে ভোটাররা চাইলে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন। যদি ‘না ভোট’ বেশি হয়, তাহলে হবে পুনঃভোট। তবে দ্বিতীয়বারও একক প্রার্থী থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনা-নৌ-বিমান বাহিনী যুক্ত
দেড় দশক পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী’ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে এমন বিধান ছিল। নতুন এই সংযোজনের ফলে আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তিন বাহিনীর ভূমিকা আবারও ভালভাবে দৃশ্যমান হতে পারে।
নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা ও আর্থিক স্বচ্ছতা
নতুন আইনে প্রতি ভোটারে সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় এবং মোট ২৫ লাখ টাকার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুদানের তথ্য প্রকাশে বাধ্যতামূলক ধারা যুক্ত হয়েছে- দল বা প্রার্থীকে ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তালিকা দিতে হবে।
এছাড়া মনোনয়ন জামানত ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা ছোট দলের জন্য আর্থিকভাবে চাপের কারণ হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং ও ডিজিটাল সংযোগ
বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী, হেফাজতে থাকা ব্যক্তি বা নির্বাচনি এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং’ পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারবেন। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সংযোজন।
নির্বাচনি অপরাধে যুক্ত হলো এআই ও অপতথ্য
সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন আরপিওতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচারকে ‘নির্বাচনি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

গণমাধ্যমের উপস্থিতি ও স্বচ্ছ ভোটগণনা
ভোটকেন্দ্রে ও গণনার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ ও উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজনে বাতিল ভোট যাচাই করতে পারবেন, যাতে অন্যায়ভাবে ভোট বাদ না যায়।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর শাস্তি
দল বা প্রার্থী যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, তবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। দলীয় পর্যায়েও জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে- এটি বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে নতুন সংযোজন।
প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আরও কঠোর
প্রার্থীর হলফনামায় এখন দেশি-বিদেশি আয়ের উৎস ও কর রিটার্নের তথ্য দিতে হবে। মিথ্যা তথ্য দিলে ভোটের পরেও ইসি ব্যবস্থা নিতে পারবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা কার্যনির্বাহী পদেও থাকা ব্যক্তিরা প্রার্থী হতে পারবেন না, কারণ এসব পদকে এখন ‘লাভজনক পদ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
আলোচিত ইভিএম বাতিল ও নতুন ভোট নীতিমালা
ইসি আনুষ্ঠানিকভাবে বহুল আলোচিত ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে নতুন অনুচ্ছেদে ইভিএম ভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন থেকে শুধুমাত্র ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ হবে। ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দায়িত্ব জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রের তালিকা ইসির অনুমোদন সাপেক্ষে চূড়ান্ত হবে।

পুনঃভোট ও নির্বাচন বাতিলের বিধান
সমান ভোট পেলে আর লটারিতে বিজয় নির্ধারণ হবে না; পুনঃভোট আয়োজন করা হবে।
এছাড়া কোনো আসনে বড় ধরনের অনিয়ম হলে পুরো নির্বাচনি এলাকার ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
নতুন আরপিও, আচরণবিধি, ভোটার তালিকা আইন, নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান, পর্যবেক্ষণ নীতিমালা- সবকিছুর সংস্কার সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। কিছু রাজনৈতিক দলের সমালোচনা ও অভিযোগ থাকলেও এখন এই সংশোধিত আইনের আলোকে ‘দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি’ শিগগিরই জারি করা হবে।
নতুন আরপিও ২০২৫ নির্বাচনকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্য নিয়েই তৈরি বলে মনে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে জোটভিত্তিক প্রতীকের বিধান নিয়ে যে আপত্তি তুলেছে, তা হঠাৎ পরিবর্তন হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে বাংলাদেশে নির্বাচনের মান অনেকাংশে উন্নত হতে পারে; না হলে নতুন বিতর্কেরও জন্ম দিতে পারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









