বাংলা চলচ্চিত্রে এক সাহসী বাতিঘর তারেক মাসুদ। চলচ্চিত্রের ভাষায় যিনি এনেছিলেন নতুন দিগন্ত, দেশের ইতিহাস–ঐতিহ্য আর মানুষের আত্মিক সংগ্রামকে তুলে ধরেছিলেন অনন্য সংবেদনশীলতায়। সাধারণ জীবনযাপন, গভীর চিন্তাশীলতা ও আপসহীন শিল্পচেতনাই তাকে পরিণত করেছে ‘সিনেমাযোদ্ধা’র প্রতীকে।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) এই গুণী নির্মাতার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৬৯। ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গার নূরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া তারেক মাসুদ ২০১১ সালের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রয়ে গেছেন শত শত সিনেমাপ্রেমীর হৃদয়ে।
চাইলে আমেরিকায় স্থায়ী হয়ে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাতে পারতেন তিনি। কিন্তু সিনেমার প্রতি প্রেম আর দায়িত্ববোধ তাকে ফিরিয়ে এনেছে নিজের মাটি–মানুষের কাছে। স্বাধীনতার ইতিহাস, সংগ্রাম আর মানবিকতার গভীর গল্পগুলোকে তুলে ধরাই ছিল তার একমাত্র অঙ্গীকার।
‘মুক্তির গান’, ‘মুক্তির কথা’, ‘আদম সুরত’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’—প্রতিটি কাজেই নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলেন ২০০২ সালে নির্মিত ‘মাটির ময়না’ দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্কারে এন্ট্রি নেয় এই চলচ্চিত্র।
তারেক মাসুদের কাজ শুধু চলচ্চিত্রই নয়, হয়ে উঠেছিল সময়ের দলিল—মানুষ, সমাজ ও রাজনীতির গভীর অন্তর্দৃষ্টি।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট। ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে মানিকগঞ্জের জোকা এলাকায় ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় প্রয়াত হন তারেক মাসুদ, ক্যামেরাম্যান মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। থেমে যায় এক নির্মাতার জীবন, কিন্তু থামেনি তার নির্মিত পথের আলো।
জন্মদিনে চলচ্চিত্রাঙ্গন তাকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। তরুণ নির্মাতা ও সিনেমাকর্মীদের কাছে তারেক মাসুদ এখনো অনুপ্রেরণার বাতিঘর। পারিবারিক আয়োজন ছাড়াও এই দিনে বিভিন্ন চলচ্চিত্রসংগঠন তার কাজ নিয়ে আলোচনা, প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন ধারার পথিকৃৎ এই নির্মাতা আজ নেই। তবুও তার কাজ, তার দর্শন, তার লড়াই আগামী প্রজন্মকে আরও বহু বছর ধরে পথ দেখাবে—একজন সত্যিকারের শিল্পীর মতো।









