স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ গান এবং স্বাধীনতার প্রথম গানের সুরস্রষ্টা সুজেয় শ্যাম। ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম’, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’, ‘আয়রে মজুর কুলি’, ‘আহা ধন্য আমার জন্মভূমি’, ‘রক্ত চাই রক্ত চাই’, ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’সহ বহু দেশাত্ববোধক গান লিখেছেন ও সুর করেছেন তিনি। কণ্ঠে তুলেছেন বহু কালজয়ী গান।
সেই কণ্ঠযোদ্ধার কণ্ঠ থামলো বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে। তার প্রয়াণের খবরে শোকার্ত সংগীতের সহশিল্পী থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীরাও। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিকাতর নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী থেকে এই সময়ের তরুণ শিল্পী, সুরকার কিংবা গীতিকারও। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুজেয় শ্যামকে নিয়ে লিখছেন অনেকে-
প্রবীন সুরকার, সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান লিখেছেন, সহযাত্রী বন্ধু শব্দ সৈনিক মুক্তি যোদ্ধা সংগীত পরিচালক সুজেয় শ্যাম রাত ৩ টায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে! শান্তি কামনা করি।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নির্মাতা কাওসার চৌধুরী লিখেছেন, বিদায় শ্যাম’দা। ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি, বাংলাদেশের নাম……’, ‘বিজয় নিশান ওড়ছে ওই’সহ আরো অনেক গানের সুরস্রষ্টা শব্দ-সৈনিক সুজেয় শ্যাম। ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এই শব্দ সৈনিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সুর-সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ সব দেশাত্ববোধক আর বিপ্লবী গানের। আমাদের প্রজন্মের কাছে সুজেয় শ্যাম এক প্রবাদ প্রতীম সুরস্রষ্টা। বৃহষ্পতিবার রাত ৩টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক। বাংলাদেশের মানুষ (যারা তাঁর সুর করা গান শুনেছেন) সুজেয় শ্যামকে হৃদয়ের গভীরে লালন করবে আজীবন। সুরস্রষ্টা হিসেবে তিনি অমর। পরপারে অনেক ভালো থাকুন তিনি। বিদায় শ্যাম’দা, বিদায়!
লেখক, নির্মাতা শাকুর মজিদ স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গান (বিজয় নিশান উড়ছে ঐ) স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে একবসাতেই সুর করে তাৎক্ষণিক ভাবে প্রচার করেছিলেন এই গুণী সুরকার। আমাদের সুজয় মামা (তিনি আমাদের সহপাঠি তিন্নি দেবের আপন মামা। এ কারণে আমরা মামা ডাকতাম)। আমি যেসময় টেলিভিশনের জন্য নাটক টেলিফিল্ম বানিয়েছিলাম আমার সবচেয়ে নির্ভরতায় জায়গায় ছিলেন সুরকার-সংগীতকার সুজেয় শ্যাম। লন্ডনী কইন্যা, নাইওরী, বৈরাতী, করিমুন্নেছা – এর সবগুলোর মিউজিক তাঁর করে দেয়া। এখানেই শেষ না, এডিটিং এর সময় পাশে বসে মিউজিক ব্যালেন্স করার কাজও তিনি করে দিতেন অবলিলায়। অনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছেন। শুনেছি। আজ খবর পেলাম- তিনি আর নেই। আমার বড় নির্ভরতায় জায়গাটি শূন্য হয়ে গেল।
জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপা লিখেছেন, চলে গেলেন আমাদের সংগীতের আরেক কিংবদন্তী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সুরকার সংগীত পরিচালক ও সংগঠক সুজ্যেয় শ্যাম। শ্যামদাদা, বাংলাদেশকে। আপনি অকৃত্রিম হাতে ঢেলে দিয়েছেন। আমরা কখনো আপনাকে ভুলবো না। আপনার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
সিলেটের অন্যতম নাট্যসংগঠক শামসুল বাসিত শেরো শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, বিদায় শ্রদ্ধেয় সুজেয় শ্যাম। ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গানের সুরকার সুজেয় শ্যাম না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে সুজেয় শ্যামের নাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নয়টি গানে সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম, যেগুলো একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাওয়া হয়েছিল।
গীতিকার আসিফ ইকবাল লিখেছেন, বাংলা গানের অন্যতম দিকপাল, মুক্তিযোদ্ধো সুজেয় শ্যাম দা চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা তাঁর চিরশান্তি কামনা করি।
সংগীতশিল্পী আসিফ লিখেছেন, শ্রদ্ধেয় সুজেয় শ্যাম (কাকা)। বাংলা গানের আরো একজন কিংবদন্তীর প্রস্থান। তিনি সবসময়ের জন্য আমার একজন শ্রদ্ধাভাজন মুরুব্বী ছিলেন। বাবু- আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে। বিনম্র শ্রদ্ধা।
শিল্পী পান্থ কানাই লিখেছেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা , একজন বাংলা গানের দিকপাল, একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন বাংলা গানের অভিভাবক সুজেয় শ্যাম দা আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি গভীর শ্রদ্ধা আর ভক্তির সাথে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।
নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী লিখেছেন, বাংলা গানের অন্যতম দিকপাল,মুক্তিযোদ্ধো সুজেয় শ্যাম মামা চলে গেলেন। পরপারে ভালো থাকবেন।তাঁর চিরশান্তি কামনা করি।শুভ্র দা আপনি, আপনার পরিবার যেন শোক কাটিয়ে ওঠেন।
গবেষক, আলোকচিত্রশিল্পী ও নির্মাতা শামসুল আলম বাবু লিখেছেন,“বিদায় সুজেয় দা। সুজেয় শ্যাম (১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ, সিলেট – ১৮ অক্টোবর ২০২৪) একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার, সংগীত পরিচালক, কণ্ঠযোদ্ধা। বাবা অমরেন্দ্র চন্দ্র শ্যাম এবং মা শান্তি সুধা শ্যাম। সুজেয় শ্যাম সংগীত শিল্পী, সংগীত পরিচালক, সুরকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি আব্দুস সামাদের ‘সুর্য গ্রহণ’ (১৯৭৬) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। রাজা হোসেন খানের সাথে তাঁর জুটি ছিল। ২০০২ সালে হাছন রাজা, ২০০৪ সালে জয়যাত্রা, ২০১০ সালে অবুঝ বউ এবং ২০২১ সালে জৈবতী কন্যার মন চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ সুরকার সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ৩২ বছর আগে ঢাকার পল্লবী থেকে কোলকাতায় পর্যন্ত তাঁর সংগীত পরিচালনায় – গান লেখা থেকে রেকোর্ডিং পর্যন্ত পুরো সংগীতায়নের কাজে অংশগ্রহণে আমি শিখেছিলাম অনেক কিছু।
অভিনেত্রী বিজরী বরকতউল্লাহ লিখেছেন, একুশে পদকে ভূষিত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগীতযোদ্ধা, দেশ বরেন্য সংগীত শিল্পী, সুরকার সুজেয় শ্যাম আর নেই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। গভীর শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
শিল্পী মুহিন লিখেছেন, প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় সুজেয় শ্যাম কাকু আর নেই। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন এই মহান সুরস্রষ্ঠা। তিনি একাধারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বাংলা সিনেমা, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন কিংবদন্তী সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে। তাঁর কৃতিত্ব বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে আছে এবং থাকবে। সবাই তার আত্মার জন্য দোয়া করবেন।
সংগীতশিল্পী প্রিয়াঙ্কা গোপ লিখেছেন, “কাকু, আপনিও হারিয়ে গেলেন চিরতরে! ভেবেছিলাম এ যাত্রায় ফিরবেন! আপনার স্নেহ, আশীর্বাদ আমার পাথেয় হয়ে থাকবে। আপনার প্রতি কোটি প্রণাম। আপনার মতো একজন অত্যন্ত সৎ, গুণী ও ভালো মানুষ যেন ঈশ্বরের কাছে খুব ভালো থাকেন এই প্রার্থনা করি। আপনার কর্মের মাধ্যমে আজীবন আপনি বেঁচে থাকবেন। সকলে সুজেয় শ্যাম কাকু’র আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করবেন।”
তরুণশিল্পী ইউসুফ আহমেদ খান স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, একটা নির্ভরতার হাত খুব বেশি মিস করবো। বিদায় কিংবদন্তি সুরকার সংগীত পরিচালক সুর সৈনিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন অন্যতম যোদ্ধা -স্যার সুজেয় শ্যাম। প্রথম সেই গান- বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…শ্যাম মামা.. শ্রদ্ধা সালাম…।








