হুমায়ূন আহমেদ এক বিচিত্র চরিত্রের মানুষ ছিলেন। একথাটা যারা হুমায়ূন আহমেদ এর পাঠক। যারা তাকে ভালোবাসেন যারা তার সঙ্গে চলাফেরা করেছেন তাদের সবারই জানা। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে তার নানাভাবে পাঠকদের কাছে বা বন্ধুদের কাছে উপস্থাপন করেছেন সেটা করে তিনি কি আনন্দ পেতেন। এমনও ঘটনা আছে যে ঘটনায় হুমায়ূন আহমেদ নিজেই যথেষ্ট এনার্জি দিয়েছেন এমনকি টাকা পয়সা খরচ করেছেন। তারপরও তিনি ভেবেছেন মানুষ আনন্দ পাক। মানুষকে তিনি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করেছেন নানাভাবে। হুমায়ূন আহমেদ এর জীবনের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাই তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন তার বেশিরভাগ সময়েই আনন্দে কাটিয়েছেন। বিশেষ করে তার চারপাশের মানুষকে তিনি আনন্দে রাখার জন্য যা করার তাই করেছেন।
তাকে নিয়ে অনেক ঘটনা মনে পড়ে। পৃথিবী থেকে চলে গেছেন তিনি মাত্র ৬৩ বছর বয়সে। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তবে যাবার আগে শেষ দশ বছর যদি দেখি তাহলে আমাদের কাছে অনেক কিছুই অদ্ভুত মনে হতে পারে। আমাদের কাছে মনে হতে পারে তিনি কেন এমন করেছেন! কিন্তু সময় হয়তো জবাব দেবে। সময়ের অপেক্ষায় থাকবো। আমরা যদি একটু ভাবি তিনি কথার জাদুকর ছিলেন। লেখার জাদুকর ছিলেন। কিন্তু দলবল নিয়ে আড্ডা দেয়ায়ও ছিলেন জাদুকর। একদিন তিনি সবাইকে নুহাশ পল্লীতে ডাকলেন। বললেন, তিনি নিজে দেখেছেন নুহাশ পল্লীতে আত্মা ঘোরাঘুরি করে। কেউ তো বিশ্বাস করতে চান না।
তিনি বললেন, আজ রাতে তোমাদের আত্মা দেখানো হবে। রাতে সব বৈদ্যুতিক লাইট বন্ধ করে মোমবাতি জ্বালানো হবে। আমরা আজ প্ল্যানচেট তৈরি করবো। প্ল্যানচেট হলো একটি কাঠের তৈরি যন্ত্র, যা সাধারণত হার্ট আকৃতির হয়ে থাকে। এটি মৃত ব্যক্তিদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহার করা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। প্ল্যানচেট ব্যবহারের মাধ্যমে, কিছু লোক বিশ্বাস করে যে তারা মৃত ব্যক্তিদের আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং তাদের বার্তা পেতে পারে। তবে, এটি একটি বিতর্কিত বিষয় এবং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্ল্যানচেট ব্যবহারের ধারণাটি এসেছে এই বিশ্বাস থেকে যে, প্ল্যানচেট একটি মাধ্যম হিসাবে কাজ করে এবং এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্ল্যানচেট ব্যবহার করার সময়, সাধারণত একটি বৃত্তাকার টেবিলের উপর একটি প্ল্যানচেট রাখা হয় এবং অংশগ্রণকারীরা তাদের আঙুল দিয়ে এটি স্পর্শ করে থাকে। যখন প্ল্যানচেট নড়াচড়া করে, তখন এটি একটি বার্তা নির্দেশ করে বলে মনে করা হয়।
ঢাকা শহরে গুজব ছড়িয়ে গেল আজ নুহাশ পল্লীতে আত্মা নামবে। রাতে খাবারের পরে কিছু ভূতের গল্প বললেন। গল্প বলতে বলতে তিনি বললেন, আমি সাগরদের একটা ভূতের সিরিজ উপহার দেবো। এই যে দেখেন হুমায়ূন আহমেদ আড্ডার ভেতর দিয়ে একটি কাজের মেসেজও দিলেন। এরপর তিনি আপন ভুবন নামে একটি ভূতের সিরিজ তিনি ইমপ্রেসের পক্ষ থেকে করেছিলেন। যাইহোক চারদিকের আলো নিভিয়ে দেয়া হলো। সেদিন নুহাশ পল্লীতে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হাতের উপর হাত রেখে প্ল্যানচেট বানিয়ে আত্মাকে স্মরণ করতে লাগলেন। নুহাশ পল্লীতে আত্মা নামবে মহা উৎসবে আত্মাকে ডাকা হলো। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, সবাই প্রশ্ন করো। জাহিদ হাসানের পরবর্তী নাটকের নাম কী? মাহফুজের ব্যবসার পরিকল্পনা কেমন হবে। চঞ্চলের আগামী নাটক কী হবে এসব বিচিত্র প্রশ্ন। প্ল্যানচেট-এর নাকশি গলায় তিনি জবাব দিচ্ছেন। সবাই তো বিস্মিত। কী করে জানলো সে? কিছুক্ষণ পরে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, দেখ তোমরা যে প্রশ্নগুলো শুনে বিস্ময়ের ভান করছ-আমি ভানই বলবো। কারণ এই প্রশ্নগুলো সবাই তো জানে। কেননা আমি কিছুক্ষণ আগে সবার কাছ থেকে এসব জানতে চেয়েছিলাম। জাহিদ হাসানকে তো আমি আগেই বলেছি তার আগামী ছবির নাম কী! হয়তো এটা সবাই শুনেছ। শোনা প্রশ্ন না করে অদ্ভুত প্রশ্ন করা উচিৎ। সবাই ভাবতে লাগলেন অদ্ভুত প্রশ্ন কী হতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, এমন প্রশ্ন করা হোক যেটা আমরা কখনো ভাবিইনি।
তাহলে জিজ্ঞেস করা যাক শাওনের দাদির নাম কী? এটা তো আমরা কেউ জানি না। শাওন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বললেন, এই প্রশ্ন করা যেতে পারে। শিল্পী আগুন সেখানে উপস্থিত ছিলো। সে বলল, আমি তাহলে জিজ্ঞেস করছি। আগুন জিজ্ঞেস করলো, আমাদের শাওন ভাবির দাদুর নাম কী? প্ল্যানচেট বলল, এটা তো বেশ আগের কথা একটু ভেবে বলছি। মিনিট খানেকের মধ্যে একটা নাম বলল। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আমিও তো আসলে জানি না। সবাই বিস্মিত হলো প্ল্যানচেট-এর উত্তর শুনে। এরকম আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা হলো উত্তরও এলো। প্ল্যানচেট বলল, আমি আর এখন থাকতে পারবো না। সপ্তর্ষি মন্ডলের তারাগুলো একসাথে কাছাকাছি চলে আসছে। এখন আর আমাদের এখানে থাকা সম্ভব হবে না। আত্মা চলে গেল। পরের দিন নাস্তার টেবিলে সবাই নাস্তা করছে। এমন সময় শাওন জিজ্ঞেস করলো, কাল যে আপনি আমার দাদুর নাম জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে হঠাৎ করে দাদুর নাম নিলেন? নুহাশ পল্লীতে একজন সহকারী ছিলো তার নাম জুয়েল। তাকে দিয়েই হুমায়ূন আহমেদ এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন।
সবাই হুমায়ূন আহমেদের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালেন। বুঝে ফেললেন, প্ল্যানচেটের আসল রহস্যটা কি। হুমায়ূন আহমেদ আগেই শাওনের দাদির নাম জেনে নিয়েছিলেন। সবাই হইচই করে উঠলেন। না, এটা ফ্রড। আমাদেরকে ডেকে এনে ঠকানো হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ঠকানো কেমনে হলো? এই যে, সকলে মিলে আনন্দ করলে, আড্ডা দিলে রাতের পার্টি হলো-এসব কম কিসে? এসবের কি কোনো দাম নাই? এই হলেন হুমায়ূন আহমেদ। সবাইকে কীভাবে আনন্দ দেয়া যায় সেই বুদ্ধি বের করলেন। সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গ মানেই আনন্দ। তার সঙ্গ মানেই নতুন কিছু সম্পর্কে জানা।
পরের গল্পটা আমি আমার মতো করে সাজাচ্ছি। কিছুটা কল্পনা কিছুটা সত্যি। কিন্তু ঘটনা যে ঘটেছে এটা নির্ভেজাল সত্যি। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। আবৃত্তি করতে ভালোবাসেন। অভিনয়ও করেন। নানারকম গল্পও করেন। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হলেই বলেন আমি রসগোল্লা খাবো নিয়ে এসো। জয়ন্তদা বাকপটুও বটে। অনেকেই হুমায়ূন আহমেদের মুখের ওপর কথা বলেন না কিন্তু তিনি ঝটপট মুখের ওপর কথা বলতেন। তিনি একদিন বললেন, হুমায়ূন- আপনি যে মানুষকে সত্যি মিথ্যা দিয়ে নাচান এটা কি ভালো কথা? হুমায়ূন আহমেদ খুব যে সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন আমার মনে হয় না। যদিও তিনি সমালোচনা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সবক্ষেত্রেই তার যুক্তি থাকতো। তিনি মনে করতেন তিনি যা করেছেন ঠিকই করেছেন। সৃষ্টিশীল মানুষের নানারকম খেয়াল থাকতে পারে। একবার তার একটা নাটকের শুটিং শেষে তার খেয়াল হলো শিল্পীদের যে পারিশ্রমিক সেটা তিনি নিজের হাতে দেবেন। নিজের হাতে দিতে গেলে একটা বিশেষত্ব তো থাকতে হবে। তিনি বললেন, সাগর এই নাটকের পারিশ্রমিক আমি নিজের হাতে যেহেতু তুলে দেবো এবং বিকেলে দেবো তাহলে তো নতুন নোটের প্রয়োজন হবে। চ্যানেল আইতে এসে তিনি যখন আমার রুমে আসতেন তখন বলতেন, মালিকের চেয়ারে তো বসা যাবে না। আমি তো আর মালিক না। আমি চেয়ার ছেড়ে বললাম আপনি আমার চেয়ারে বসবেন। তিনি বললেন, না আমি ওই চেয়ারে বসতে পারি না।
তাহলে সামনের চেয়ারে বসবেন?
তিনি বলতেন, আমি হুমায়ূন আহমেদ সামনের চেয়ারেও বসবো না, বলেই তিনি টেবিলে বসে পড়তেন। বসেই বলতেন শক্ত টেবিল তো ভেঙে পড়বে না তো?
আমি বলতাম, না না। ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
তিনি টেবিলে বসেই নতুন নোটগুলো হাতে নিয়ে তার সহকারীকে সবার নাম ডাকতে বললেন। এই দলের মধ্যে আসাদুজ্জামান নূর এবং আফসানা মিমিও আছেন। তারাও বাইরে অপেক্ষা করছেন। হুমায়ূন আহমেদ একেকজনকে ডাকেন আর নগদ টাকা গুনে দেন। বাইরে তখনও আসাদুজ্জমান নূর ও আফসানা মিমি অপেক্ষা করছেন। নূর ভাই তখনই অনেক বিখ্যাত মানুষ। রাজনীতিও শুরু করেছেন। ব্যাপক পরিচিতি তার। ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখাচ্ছিল না। একদম শেষে আসাদুজ্জামান নূর এবং আফসানা মিমিকে ডাকলেন। তারা তো মহাবিরক্ত হয়ে রুমের ভেতর ঢুকলেন। হুমায়ূন আহমেদ টাকা গোনার ভান করলেন মনে হলো। তারপর বললেন, শোনেন আপনাদেরকে আমি শেষে ডেকেছি কেন? টাকা দেয়ার জন্য নয়। আপনাদেরকে ডেকেছি কফি খাওয়ার জন্য। এই শাহজাহান, ভালো করে কফি বানাও। তিনি আমাদের অফিসের পুরনো কর্মচারী শাহজাহানকে ডেকে কফির অর্ডার দিলেন। কোথায় রাগ! কোথায় হুমায়ূন আহমেদের প্রতি বিরক্ত ভাব! হো হো করে হেসে উঠলেন নূর ভাই আর আফসানা মিমি। আসাদুজ্জামান নূর এবং আফসানা মিমি চেয়ারে বসে দু ঘণ্টা আড্ডা দিলেন। এই হলেন হুমায়ূন আহমেদ।
আর ওই যে জয়ন্তদার কথা বললাম, তিনি বলেছিলেন, হুমায়ূন আপনি আমাদেরকে এভাবে নাচাচ্ছেন কেন? হুমায়ূন আহমেদ সেই কথা ভোলেননি।
হুমায়ূন আহমেদ বললেন, জয়ন্ত তুমি যে বললে, আমি নাচাচ্ছি কেন? তোমাকে এমনভাবে নাচাবো তুমি বুঝবে।
জয়ন্তদা বললেন, আমি ভয় পাই না।
একদিন হুমায়ূন আহমেদ আমার কাছে এলেন প্রস্তাব দিলেন একটি সিনেমা করার। সিনেমার নাম ‘ঘেটপুত্র কমলা’। ঘেটুপুত্র কমলাতে জয়ন্তদাকে তিনি যে চরিত্র দিলেন তাতে করে জয়ন্তদাকে যে কতবার নাচতে হয়েছে তা তো সব দর্শকের জানা! হুমায়ূন আহমেদ এই ছবির মাধ্যমে মধুর প্রতিশোধ নিলেন নাকি সবাইকে আনন্দের সাগরে ভাসালেন! আজ ১৯ জুলাই হমায়ূন আহমেদের প্রস্থানের দিন। যদিও আমাদের দুখের দিন কিন্তু তার মতো একজন মানুষের সঙ্গ আমরা পেয়েছিলাম বলেই আমরা গেয়ে উঠতে পারি-আহা কী আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে।









