বয়ঃসন্ধি হলো জীবনের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের শরীর শিশু অবস্থা থেকে কিশোর অবস্থায় পৌঁছায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ বছর থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে বা মেয়েকে কিশোর বা কিশোরী হিসেবে অভিহিত করা হয়। এর যেকোনো সময়ে বয়ঃসন্ধি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। অনেক সময় ১৯ বছরের পরও বয়ঃসন্ধির ব্যাপ্তি থাকে। এসময় ছেলে ও মেয়েদের উভয়ের শরীর ও মনে নানা ধরণের পরিবর্তন ঘটে। ছেলে-মেয়েরা যেমন দ্রুত বেড়ে উঠে ঠিক তেমনি তাদের চিন্তা চেতনায় দেখা দেয় ব্যাপক পরিবর্তন। অথচ তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার দিকটি নিয়ে এখনও উদাসীন সমাজ-পরিবার এবং সর্বোপরি দেশ। এসময় কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ শামীমা ইয়াসমীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবেন মা-বাবা। সন্তান কোনোভাবেই যেন একা না হয়ে পড়ে এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নজর তাদেরকেই রাখতে হবে।
শামীমা ইয়াসমীন এও বলেন, বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের আগেই পরিবারকে এই বিষয়গুলো ছেলে-মেয়েকে অবগত করতে হবে। যাতে তারা এই বিষয়ে চিন্তিত না হয়। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখা খুব দরকার।
শারিরীক পরিবর্তন:
ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল আসে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে। এ বয়সে মেয়েদের উচ্চতা বাড়ে। শরীরের বিভিন্ন অংশ স্ফীত হয়। বাহুমূল ও যৌনাঙ্গে লোম গজায়। মাসিক শুরু হয়। তেমনি ছেলেদের ক্ষেত্রে, এসময় তাদের দেহের উচ্চতা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে, গলার স্বর ভারি হয়ে আসে, কাঁধ চওড়া হয়, পেশী সুগঠিত হয়। মুখে দাড়ি-গোঁফ ওঠে সেই সঙ্গে শরীরের নানা জায়গায় বিশেষ করে, বুকে, বাহুমূলে ও যৌনাঙ্গে লোম গজায়। এই সময়ে ছেলেরা একটু বেশি ঘামে। বয়ঃসন্ধির এই সময়টা ছেলে মেয়ের প্রজনন ক্ষমতা বিকাশ হতে থাকে বলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ হয়।
মানসিক পরিবর্তন:
বয়ঃসন্ধিকালীন এই সময় থেকে ছেলে-মেয়েদের আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা তৈরি হয়। তার কী পছন্দ-অপছন্দ, সে কী চায়। এছাড়া নিজের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এবং তারা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে জীবনের এই পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে। বয়ঃসন্ধির সময় তারা স্বাধীনভাবে সবকিছু ভাবতে শুরু করে। সে কী পরবে, কী খাবে, কাদের সাথে মিশবে সেটা সে নিজে সিধান্ত নেয়। যা তার পরিবারের থেকে আলাদা হতে পারে। ছোট থেকে বড় হওয়ার এই সময়টাতে বড় ধরনের মানসিক ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এই ছেলে মেয়েদের। এ সময় তাদের মধ্যে হরমোনাল কারণে আবেগের প্রাবল্য দেখা দেয়। মুড সুইং হয় বা মন মেজাজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে। আনন্দ, রাগ, দুঃখের মতো অনুভূতিগুলো তীব্র মাত্রায় দেখা যায়। এ বয়সের প্রাণচাঞ্চল্য ভেতরের সৃজনশীলতার বিকাশে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
পরিবারের ভূমিকা :
বয়ঃসন্ধিতে থাকা ছেলে মেয়েরা ভীষণ কৌতূহলপ্রবণ হওয়ায় অনেক সময় তাদের বিপথগামী হওয়ার, মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়া, অযাচিত ঝুঁকি নেয়া বা অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।
আবার এই বয়সটায় স্বাধীন আত্মপরিচয় গড়ে ওঠায় তারা সব কিছু নিয়ে ভীষণ সংবেদনশীল থাকে। তাই তাদের সঠিক পথে রাখতে পরিবারকে কৌশলী ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের আচার আচরণের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে সন্তানের সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া বা কোনভাবেই গায়ে তোলা যাবে না। এছাড়া অন্য কারো সাথে তুলনা করা বা ছোট করে কথা বলা যাবে না। এই বয়সে ছেলে মেয়েদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতিও শ্রদ্ধা রাখতে হবে। বন্ধুবান্ধবের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। তবে তারা কী করছে, কাদের সাথে মিশছে সেটা অন্যভাবে সুপারভিশন করতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বয়ঃসন্ধির সময় কিশোর-কিশোরীদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া, কি ভালো,কি খারাপ সেই শিক্ষাটাও এখান থেকে দিতে হবে।







