দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে আলু উৎসবের। উৎসব উপলক্ষে ঢাকার বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর দুইদিন ধরে চলে আর্ন্তজাতিক মেলা ও প্রদশর্নী। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন এ আলু উৎসবের আয়োজন করে। শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) সকালে আলু উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. একে ফজলুল হক ভূঁইয়া, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইউরিস ভ্যান বোমেল, হ্যাংজু ফিমা এক্সপো কোং লিমিটেড চায়নার জেনারেল ম্যানেজার টনি এলভি।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হিমাগার মালিক, কৃষক, ব্যবসায়িক নেতা ও বিভিন্ন উদ্যোক্তা অংশ নেন।

আলু উৎসবে অংশ নিতে অনেক কৃষকের সঙ্গে জয়পুরহাট থেকে আসা কৃষক কাসেম এবং রনিও ছিলেন। কৃষক কাসেমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। বিঘা প্রতি তার খরচ হয়েছিলো ৪০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা থেকে ফলন পেয়েছেন ১২০ মণ করে, যা হিমাগারে না রেখে ক্ষেত থেকেই বিক্রি করে পেয়েছেন ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় লাভ ২০ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকার পুরোটা তার লাভ তা বলা যাবে না। কারণ কাসেমের মতো ক্ষুদ্র বা মাঝারি কৃষকেরা নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা মিলে চাষাবাদে শ্রম দেন। তারা এই শ্রমের মূল্য হিসেব করেন না।
কাসেম মনে করছেন, সে সময় তার টাকার প্রয়োজন ছিলো বলে হিমাগারে না রেখে সব আলু বিক্রি করে দিয়ে ভালোই করেছিলেন। হিমাগারে রাখলে কোনভাবেই তিনি আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া পর্যন্ত দিতে পারতেন না। যেমনটা করেছেন কৃষক রনি। রনিও কাসেমের মতোই ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ভালো দাম পেতে মৌসুমে বিক্রি না করে তিনি আলু রেখে দিয়েছিলেন হিমাগারে। ফলে তিনি ব্যাপক লোকসানের মুখোমুখি হয়েছেন। শুধু রনি নন, বাংলাদেশের অনেক কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরাই এ বছর আলু হিমাগারে রেখে বড় লোকসান গুণছেন।
এ বছর আলু চাষে লোকসান কেন?
আলু উৎসবে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এবং প্রধান অতিথি কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দু’জনের বক্তব্যেই উঠে আসে আলু চাষে এ বছর কী কারণে লোকসান হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাতে তারা বলেন, এ বছর রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে; যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন বেশি। ২০২৫ সালে আলু উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি স্থানভেদে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। হিমাগারে সংরক্ষণ খরচ, পরিবহণ, বস্তা, লেবার ও অন্যান্য খরচসহ কেজিপ্রতি আলুর হিমাগার গেটে খরচ দাঁড়িয়েছে ২০-২৫ টাকা। বিপরীতে আলু চাষি কৃষকরা হিমাগার গেটে ৮ থেকে ১৬ টাকা কেজি মূল্যে আলু বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। যা তাদের উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কম। এর ফলে আলু চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রাজশাহীর তানোর থেকে আসা আলুচাষি লিমন আহমেদ জানান, গত বছর তিনি ১১৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। সেই আলু বিক্রি করেছেন ১২ থেকে ১৪ টাকায়। একই উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চোরখৈর গ্রামের আলুচাষি রানা চৌধুরী এবার হিমাগারে ১ হাজার ২৫০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। তিনি ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘সরকার ৫০ হাজার টন আলু ২২ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো আলু কেনা হয়নি।’ কুড়িগ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, একবছর আলু বিক্রি করে লাভ হয়, আরেক বছর ক্ষতি।
২০১০ সালের পর থেকে আলু উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোন বছর আলু চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদন হয়েছে এবং কোন বছর চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন হয়েছে। যেমন ২০১০, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭ সালে চাহিদার তুলনায় আলু বেশি উৎপাদন হয়েছে। ফলে আলু চাষকারী কৃষক, আলু ব্যবসায়ীগণ এবং হিমাগার মালিকগণ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। যে বছর কৃষকরা আলু বেশি চাষ হয়, সে বছর আলুর দাম কম পান কৃষক। এর ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে কৃষকগণ আলু চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং কম জমিতে আলু চাষ করতে থাকেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে চাহিদার তুলনায় কম আলু উৎপাদন হয় এবং হিমাগারগুলিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে ২০% থেকে ২৫% আলু কম সংরক্ষণ হয়। ফলে গত ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে আলুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এবং ২০২৩ সালে কেজি প্রতি আলু সর্বোচ্চ ৬০ টাকা এবং ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হতে দেখা গেছে। আলুর দাম বেশি দেখে গত মৌসুমে কৃষক বেশি পরিমাণ আলু চাষ করেছেন, ফলনও ভালো হয়েছে।
এবছর আলুর দাম কমে যাওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে, ইতোমধ্যে নতুন আলু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। বাজারে নতুন আলুর চাহিদা সবসময় বেশি থাকে।
মানুষ কেন নতুন আলু খেতে পছন্দ করে?
আলু উৎসবে ঘুরতে আসা গৃহিনী মিলি ফারজানা বলেন, পুরাতন আলু দিয়ে রান্না তরকারি মিষ্টি মিষ্টি লাগে, তাই নতুন আলু উঠলে আমি নতুন আলুই খেতে পছন্দ করি।
পুষ্টিবিদ রীদা নাজনিন বলেন, পুরাতন আলু দিয়ে রান্না করলে তরকারি মিষ্টি মিষ্টি লাগার প্রধান কারণ হলো আলুর ভেতরের শর্করার (স্টার্চ) রাসায়নিক পরিবর্তন। নতুন আলুতে বেশি থাকে স্টার্চ। কিন্তু আলু দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকলে, বিশেষ করে ঠান্ডা বা শীতল জায়গায়, স্টার্চ ধীরে ধীরে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের মতো চিনিতে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলে কোল্ড-ইনডিউসড সুইটিং (cold-induced sweetening)। আলু জীবিত কন্দ, সংরক্ষণের সময়ও তার ভেতরে শ্বাসক্রিয়া চলে। এতে শক্তি জোগাতে স্টার্চ ভাঙে, এর ফলে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়। রান্নার সময় তাপ লাগলে এই চিনি সহজেই জিভে ধরা পড়ে, তাই তরকারি অপ্রত্যাশিতভাবে মিষ্টি লাগে, এমনকি লবণ-ঝাল ঠিক থাকলেও।
আলুচাষে সংকট কোথায়?
আলু উৎসবে স্টল করে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের পুরাতন বীজ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের একটি এ আর মালিক সিডস প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউস সোপান মালিক বলেন, বাংলাদেশের কৃষক সহসা নতুন জাতের আলু চাষ করতে চান না। মূলকথা কৃষক ফলন নিয়ে রিস্ক নিতে চান না। ফলে একই জাতের আলু দিনের পর দিন চাষ করে আসছেন কৃষক। এছাড়া বাংলাদেশে আলু চাষে সংকট বা সমস্যার কারণগুলো মূলত উৎপাদন-বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, ও বাজার দামে স্থিতিশীলতার অভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এক বছর অনেক বেশি আলু উৎপন্ন হয়ে যায়, আবার কিছু বছরে উৎপাদন কমে যায়। ফলে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে না। এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং চাষিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে তোলে। বাজারে আলু সরাসরি কৃষক থেকে বিক্রি হতে না পারায়, মধ্যম্যান বা দালাল মাঝে প্রবেশ করে দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রণিকদের ভূমিকা কম হয়। এতে কৃষক কম মূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের খ্যাতনামা বীজ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ট্রেড কর্পোরেশনের সত্ত্বাধিকারী আরিফুল হক বলেন, ‘এ বছর বীজ আলু উৎপাদন করেও লোকসান গুণেছি। গত মৌসুমে কৃষক আলুর দাম না পাওয়ায় এ বছর অনেকেই আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় নতুন জাতের আলু চাষে কৃষকের অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত উৎপাদন হয় রান্না করার আলু। আমরা যেভাবে তরকারিতে সহকারি সবজি হিসেবে আলু খাই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আলু এইভাবে রান্না করে না। ফলে আমাদের উৎপাদিত আলু তারা নেবে না। তারা আলু নিতে চায় চিপস বা ফ্রেঞ্জ ফ্রাই করার উপযোগী। আমাদের কৃষক সেই ধরণের আলু চাষ করেন না। কৃষকের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা কৃষকের জন্য সেই আলুর বাজার তৈরি না করলে শুধু শুধু কৃষক ওই আলু উৎপাদন কেন করবে?’

ঢাকায় নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র অ্যাডভাইসর ওসমান হারুনী দুটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা বললেন। বাংলাদেশে চাষকৃত আলুর প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ আসে নেদারল্যান্ডস থেকে। সারা পৃথিবীতেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যার ফলে নেদারল্যান্ডসেও বীজ উৎপাদন বিলম্ব হচ্ছে। আবার নেদারল্যান্ডস থেকে যে পথে আলু বীজ আসতো, ভূমধ্যসাগরী রাজনৈতিক সংকটের কারণে সে পথে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ঘুরে আসতে আরও ১০-১৫ দিন বেশি সময় লাগছে। এর একটি বড় রকমের প্রভাব পড়ছে দেশের আলু উৎপাদন খাতে। এই সংকট সমাধানের একটি উপায় হচ্ছে দেশেই আলুবীজ উৎপাদন। নেদারল্যান্ডসের কোম্পানিগুলো বীজ উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে কোন প্ল্যান্ট ভ্যারাইটি অথোরিটি নেই। হওয়ার কথা ছিলো, এখনও হয়নি। যার কারণে জাতের সত্ত্ব রাখা কঠিন। এ কারণে অনেক কোম্পানিই ভালো জাতের আলুর বীজ এখানে উৎপাদন করতে আগ্রহী হবে না।
কোল্ড স্টোরেজে আলু ডিসেম্বর পর্যন্ত রাখার অনুরোধ কৃষি উপদেষ্টার
কোল্ড স্টোরেজের আলুর দাম না থাকায় আলু চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আলু উৎসবে মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ডিসেম্বর পর্যন্ত কোল্ড স্টোরেজে পুরাতন আলু সংরক্ষণ করতে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনকে অনুরোধ জানান। তাছাড়া এ বছর নতুন আলু বাজারে আসতে ১৫ দিন বেশি সময় লাগবে। তাই কৃষকদের বৃহত্তর স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা হয়তো সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে। তবে খাদ্য উৎপাদনের কারিগর কৃষকরা লাভবান হবেন। তিনি এ সময় কেজিপ্রতি আলু উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান।
উপদেষ্টা বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণে আলু উৎপাদিত হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। বাংলাদেশে মাত্র ২% আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় অথচ বিশ্বের অন্য দেশে এর পরিমাণ ৭%। তাই আলু প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।
‘আগামী বছর ২ লাখ মেট্রিকটন আলু যাবে ভিয়েতনামে’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন- কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। শুধু মানুষের খাদ্যই নয়, প্রাণিখাদ্যকেও নিরাপদ ও যথাযথ পুষ্টিকর করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও তিনি বলেন, আগামী বছর ২ লাখ মেট্রিকটন আলু ভিয়েতনামে রপ্তানির কাজ চলছে। ভিয়েতনাম বাংলাদেশ থেকে আলু নিতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছে।
যে ভাবে নিশ্চিত করতে হবে আলু চাষীর লাভ
দেশে প্রায় ৮০ লাখ টন আলুর ভোক্তা চাহিদা রয়েছে, যার একটি অংশ প্রক্রিয়াজাত করে চিপস ও ক্র্যাকার্স তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়। কিন্তু আমাদের কৃষকেরা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আলু উৎপাদন করে, উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে। ঢাকায় কিংডম অফ দি নেদারল্যান্ডস এর রাষ্ট্রদূত ইউরিস ভ্যান বোমেল বলেন, তিনটা বিষয়ে গুরুত্ব দিলেই আলু বিষয়ক সংকট সমাধান সম্ভব।
এক. মানসম্মত হিমাগার তৈরিতে বিনিয়োগ করা।
দুই. আলুর মূল্যসংযোজনের জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।
তিন. উৎপাদিত আলু এবং প্রকিয়াজাতকৃত আলুর রপ্তানি বাজার তৈরি করা।

ট্রু পটেটো সিড
আলুর বীজ সংরক্ষণ এবং পরিবহন খরচ কমানোর একটি উপায় হতে পারে ট্রু পটেটো সিড উৎপাদন। ট্রু পটেটো সিড বা সংক্ষেপে TPS হলো আলু গাছের ফুল থেকে তৈরি হওয়া আসল বীজ। আমরা সাধারণত আলু বলতে যে কন্দ ব্যবহার করি, সেটি আসলে বীজ নয়; বরং গাছের একটি অংশ। কিন্তু আলু গাছে ফুল এলে পরাগায়নের মাধ্যমে ছোট সবুজ ফল বা বেরি তৈরি হয়, আর সেই ফলের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র বীজই হলো ট্রু পটেটো সিড। এই বীজ দেখতে অনেকটা টমেটোর বীজের মতো এবং আকারে খুবই ছোট।
TPS ব্যবহার করে আলু উৎপাদনের পদ্ধতি কন্দের তুলনায় আলাদা ও একটু দীর্ঘ। প্রথমে TPS বীজ নার্সারি বা ট্রেতে বপন করে চারা তৈরি করতে হয়। প্রায় ২৫–৩০ দিনের মধ্যে চারা উপযোগী হলে তা জমিতে রোপণ করা হয়। এই প্রথম মৌসুমে সাধারণত বড় আকারের আলু পাওয়া যায় না; বরং ছোট ছোট কন্দ বা মিনি টিউবার তৈরি হয়। এরপর সেই মিনি কন্দ পরের মৌসুমে রোপণ করলে তখন বাণিজ্যিক আকারের আলু উৎপাদন সম্ভব হয়। অর্থাৎ TPS থেকে সরাসরি বড় আলু পেতে হলে সময় ও ধৈর্য দুটোই দরকার।
ট্রু পটেটো সিডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খুবই হালকা, সহজে সংরক্ষণযোগ্য এবং পরিবহন খরচ অত্যন্ত কম। অল্প কয়েক গ্রাম বীজ দিয়েই হাজার হাজার চারা তৈরি করা যায়। কন্দের মতো এতে ভাইরাস বা বীজবাহিত রোগ থাকার ঝুঁকি কম, তাই রোগমুক্ত বীজ আলু উৎপাদনের ক্ষেত্রে TPS-এর গুরুত্ব অনেক। পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবন ও গবেষণার জন্য TPS খুব কার্যকর, কারণ এতে জিনগত বৈচিত্র থাকে।
তবে বাস্তব চাষের ক্ষেত্রে TPS-এর কিছু বড় সীমাবদ্ধতাও আছে। বীজ থেকে চারা তৈরি, চারার যত্ন, জমিতে রোপণ এবং পরে ছোট কন্দ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় বাড়তি সময়, দক্ষতা ও পরিচর্যা প্রয়োজন। সব গাছ থেকে একই রকম আকার ও মানের আলু পাওয়া যায় না, কারণ TPS থেকে জন্মানো গাছগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্নতা থাকে। এ কারণে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া TPS ব্যবহার করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো আলু চাষে কন্দই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতি। কৃষকরা এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত, ফলন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং দ্রুত পাওয়া যায়। তবে বীজ আলুর সংকট, কোল্ড স্টোরেজের ব্যয় এবং রোগমুক্ত বীজের প্রয়োজন বিবেচনায় ট্রু পটেটো সিড ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে, বিশেষ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বীজ উৎপাদন উদ্যোগ বা আধুনিক নার্সারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে।
আলু উৎসবে ট্রু পটেটো সিড প্রদর্শন করে প্ল্যান্টেন অ্যাগ্রো লিমিটেড। এছাড়াও বিভিন্ন স্টলে আলু দিয়ে তৈরি বাহারি খাবার প্রদর্শিত হয়।











