জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনার তদন্তে অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বাসাসহ অন্তত পাঁচটি জায়গা শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে হত্যাচেষ্টার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। তিনি গুরুতর আহত হয়ে এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর পরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও স্থানগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে; উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। তার বাবার নাম মো. হুমায়ুন কবির ওরফে আবদুল মালেক মুন্সি।
গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে একটি অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুট করা হয়। এ ঘটনায় আদাবর থানায় করা মামলায় অভিযুক্ত ফয়সাল করিমকে প্রধান আসামি করা হয়। ৭ নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মোবাইল ফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর ফয়সাল করিমের জামিনের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেন অ্যাডভোকেট কায়সার কামাল ও অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ আলী ও বিচারপতি এসকে তাহসিন আলীর বেঞ্চ তাকে ছয় মাসের জামিন দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই দিন আদেশ দেওয়ার পর আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ১৯ ফেব্রুয়ারি আদেশটি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। সাধারণত আদেশ প্রস্তুত ও আপলোডে সময় লাগলেও এই ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়।
এরপর চলতি বছরের ১২ আগস্ট জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য পুনরায় আবেদন করা হলে বিচারপতি মোহাম্মদ আলী ও বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমনের বেঞ্চ নতুন করে এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। ফলে অস্ত্র আইনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর এক দফা ছয় মাস এবং পরবর্তী দফায় এক বছরের জামিন পান ফয়সাল করিম মাসুদ। হাইকোর্টের এই দুটি আদেশের কপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে।
এলিট ফোর্স র্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, তারা বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখে মাসুদকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে।
পুলিশের পিসিআর রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ফয়সাল করিম ঢাকার আদাবর থানাধীন পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করতেন।
অন্যদিকে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনার পর যশোরের বেনাপোল সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সংস্থাটি জানায়, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সীমান্তজুড়ে নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, হাদিকে গুলির ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্তের পর তাদের গ্রেপ্তার করতে অন্তত পাঁচ জায়গায় অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে, সন্ত্রাসীরা বারবার অবস্থান বদলে ফেলা ও সিমকার্ড পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তারে বেগ পেতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গুলিবিদ্ধ হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলায় মোটরসাইকেল চালক ও তার পেছনে বসে যিনি গুলি করেছে তাদেরকে আসামি করা হবে।
এদিন দুপুরে শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি বলেন, ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
এর আগে, শুক্রবার দুপুরে রিকশাযোগে বিজয়নগর এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি ওসমান হাদিকে অনুসরণ করে। একপর্যায়ে তাকে বহনকারী অটোরিকশার কাছে গিয়ে তার মাথায় গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর তারা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও একটি অপারেশন শেষে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, হাদির মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে সেহেতু এখন কনজারভেটিভভাবেই ম্যানেজ করতে হবে। তার কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে। তবে সার্বিকভাবে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।









