ভারতের কেরালা রাজ্যে ওনাম উৎসবের ঠিক আগের দিন, ৪৫ বছর বয়সী এক নারী সোভানা অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কিছু দিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হয় একটি অত্যন্ত বিরল ও প্রাণঘাতী সংক্রমণে, যার নাম “মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা রোগ”।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সোভানা, মালাপ্পুরাম জেলার এক গ্রামে ফলের জুস বোতলজাত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রথমদিকে তার হালকা মাথা ঘোরা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠান। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং ওনাম উৎসবের মূল দিন ৫ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
এই প্রাণঘাতী সংক্রমণের পেছনে রয়েছে নেগেলেরিয়া ফাউলেরি, যা সাধারণত “ব্রেইন-ইটিং অ্যামিবা” নামে পরিচিত। এটি একটি সেল বিশিষ্ট জীবাণু, যা সাধারণত গরম ও অস্বাস্থ্যকর মিষ্টি পানিতে বাস করে এবং নাকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। রোগটির নাম “প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস (পিএএম)”।
কেরালায় এই সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল হলেও, চলতি বছরই ৭০টির বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।
কেরালায় ২০১৬ সাল থেকে এই রোগ শনাক্ত হচ্ছে, তখন বছরে ১-২টি কেস দেখা যেত। ২০২৩ সালে মোট ৩৯টি কেসে মৃত্যুহার ছিল ২৩ শতাংশ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০টি কেসে মৃত্যুহার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত পরীক্ষার মাধ্যমে আগেভাগে রোগ শনাক্ত হওয়ায় মৃত্যুহার কমছে।
কেরালার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অরবিন্দ রেঘুকুমার বলেন, মৃত্যুর হার কমছে কারণ আমরা আগেভাগেই রোগ শনাক্ত করতে পারছি এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারছি। এটা কেরালার এক অনন্য কৌশল।
বর্তমানে কেরালার পাবলিক হেলথ ল্যাবগুলো ৫টি প্রধান রোগ সৃষ্টিকারী অ্যামিবা শনাক্ত করতে পারে। প্রায় ৪০০ রকমের ফ্রি-লিভিং অ্যামিবা আছে, যার মধ্যে ৬টি মানুষের জন্য ক্ষতিকর, যার মধ্যে নেগেলেরিয়া ফাউলেরি অন্যতম।
কেরালার প্রায় ৫৫ হাজার পুকুর এবং ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন কুয়ো রয়েছে। অনেক মানুষই এই উৎস থেকে পানির চাহিদা পূরণ করে। দূষিত পুকুরের পানি কিংবা এমনকি ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত নাক ধোয়ার পানি থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। গত বছর একটি ক্লাস্টারে দেখা গেছে, কিছু তরুণ গাঁজা সিদ্ধ করে সেই পানি ভেপিং করে সংক্রমিত হয়েছে।
সরকারি উদ্যোগে সম্প্রতি আগস্ট মাসে একদিনেই ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন কুয়োতে ক্লোরিন দেওয়া হয়েছে। পুকুর ও সুইমিং পুলে সাঁতার না কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তবে বাস্তবিক কারণে প্রতিটি পুকুরে ক্লোরিন দেওয়া সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অনীশ টি.এস বলেন, মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে পানি এতই জড়িত যে পুকুর কিংবা কুয়োকে ঝুঁকিপূর্ণ বললেই সমাধান নয়। বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই মূল পথ।
নাক ঢেকে সাঁতার কাটা, শিশুদের স্প্রিংকলার থেকে দূরে রাখা, ওয়াটার ট্যাঙ্ক পরিষ্কার রাখা এবং নিরাপদ গরম পানি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। উষ্ণ আবহাওয়া ও দীর্ঘ গ্রীষ্ম নেগেলেরিয়া ফাউলেরির বিস্তারে সহায়ক। এমনকি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই অ্যামিবার বিস্তার বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইনফেকশাস ডিজিজ বিশেষজ্ঞ ড. ডেনিস কাইল বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অ্যামিবা শনাক্তই করা যায় না, ফলে অনেক রোগী চিহ্নিতই হচ্ছেন না। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধও পুরোপুরি কার্যকর নয়।









