উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (পিএসসি) খসড়ার সঙ্গে শ্রম আইন ও বিধিতে শ্রমিকের কল্যাণে বরাদ্দ লাভের অংশ না রাখার সুপারিশ করতে যাচ্ছে কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পিএসসি পর্যালোচনায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি শ্রমিকের জন্য বরাদ্দ থাকা ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ)’ না রাখার সুপারিশ করতে যাচ্ছে।
শ্রমিকসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাই দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি সম্মান রাখার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, শ্রম মন্ত্রণালয়সহ ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ ছাড়া এটি করা হলে তা হবে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন।
বাংলাদেশে ২০০৬ সালে আইন করে শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী শ্রমিকের কল্যাণে প্রত্যেক কোম্পানি তার লাভের একটি অংশ তহবিলে জমা দিতে বাধ্য। এ বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতিবছর এই তহবিলে তাদের লাভের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে থাকে। সে অর্থ দিয়ে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে খরচ করা হয়। শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় সব কোম্পানির ক্ষেত্রে এই আইন মেনে চলা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আইএলও-এর পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে আইন করে এই তহবিল গঠনে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
ডব্লিউপিপিএফ কোনো বিনিয়োগ, রাজস্ব বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করে না। যখন কোনো কোম্পানি নিট লাভ ঘোষণা করে, শুধু তখনই এটি কার্যকর হয়।
জানা গেছে, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে সরকার সম্প্রতি উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি)-এর যে খসড়া তৈরি করছে, সেখানে শ্রম আইন ও বিধি সংশোধন করে এই খাতকে ডব্লিউপিপিএফ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আলোচনা হচ্ছে।
সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা করতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একটি কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান এই কমিটির প্রধান। কমিটিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞসহ পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আছেন। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। ইতিমধ্যে কমিটি কয়েকবার বৈঠক করে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছে বলেও জানা গেছে।
কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম তামিম চ্যানেল আইকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার।
তিনি বলেন, পিএসসিতে ডব্লিউপিপিএফ থাকবে কি না, তা পুরোপুরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়। কারণ এতে আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে। বিদেশি কোম্পানিকে এই সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কমিটি প্রতিবেদনে সুপারিশ করবে কি না—সে বিষয়ে আলোচনা আছে বলে তিনি জানান। শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। লাভের ৫ শতাংশ ডব্লিউপিপিএফ তহবিলে দেওয়ার নিয়ম আছে।
এই তহবিলের মাধ্যমে রাষ্ট্র একদিকে নিয়মিত ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব পায়, অন্যদিকে শ্রমিক কল্যাণ, ন্যায্য সম্পদ বণ্টন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির খসড়া আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের। বিদেশি কোম্পানিকে যথেষ্ট সুবিধা দিয়েই এই খসড়া করা হয়েছে। তার মধ্যে শ্রমিকের সুবিধা বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার এ বিষয়ে চ্যানেল আইকে বলেন, এটা শ্রমিকের অধিকার। দেশের আইন না মেনে যদি এই সুবিধা বাদ দেওয়া হয়, তবে তা হবে শ্রমিকের স্বার্থ পরিপন্থী।
এর সঙ্গে বিনিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি আছে এবং সবাই আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের লভ্যাংশ প্রদান করে। দু-একটি কোম্পানিকে বা একটি বিশেষ ক্ষেত্রে সুবিধা দিলে সবাইকে দিতে হবে। এতে সরকারের আয় কমবে। একটি বড় অংশের শ্রমিক তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আন্তর্জাতিকভাবে এতে দেশের মানহানি হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
খসড়া পিএসসিতে বিদেশি কোম্পানিকে যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে করপোরেট কর ও আমদানি শুল্ক মওকুফ অন্যতম।
পিএসসি কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব: সম্পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ—ঠিকাদাররা প্রাথমিক উৎপাদন থেকেই গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও পরিচালনাসংক্রান্ত সব খরচ পুনরুদ্ধার করতে পারেন।
কর সুবিধা: ঠিকাদারের করপোরেট আয়কর সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়। অন্য কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পায় না।
শুল্ক ও করমুক্ত আমদানি: পেট্রোলিয়াম কার্যক্রমে ব্যবহার করা সব যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও উপকরণ শুল্ক ও করমুক্তভাবে আমদানি করা যায়, ফলে প্রাথমিক মূলধনী ব্যয় কম হয়।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ডব্লিউপিপিএফ পিএসসির কোনো বিষয় নয়। এটি দেশের প্রচলিত একটি আইন। আইন মেনেই পিএসসি করা হবে।
২০১২ সালে সমুদ্র জয়ের পর এখন পর্যন্ত সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা যায়নি। দেশের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা এবং আন্তর্জাতিক নানা ঘটনা এর জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলেও বিনিয়োগ থেমে ছিল। আর করোনা-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলো। এর আগে সাতটি কোম্পানি দরপ্রস্তাব কিনলেও একটি কোম্পানিও দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি।
বাংলাদেশে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি ডব্লিউপিপিএফ-এর বিধান মেনে চলে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান এই আইন এড়িয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ মুনাফা বিদেশে পাঠানোর প্রবণতা দেখিয়েছে। যার ফলে সরকার বৈধ রাজস্ব এবং শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আইওসিদের অনাগ্রহের প্রকৃত কারণ ভূতাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক। শিল্পখাতের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রে আইওসিদের অনীহার প্রধান কারণ ডব্লিউপিপিএফ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি ও সীমিত তথ্য: বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকা এখনো একটি ফ্রন্টিয়ার বেসিন, যেখানে আধুনিক সিসমিক ডেটা সীমিত। দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপ অপর্যাপ্ত।









