সাউথ আফ্রিকার দেয়া হিমালয়সম লক্ষ্য তাড়ায় নেমে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রোটিয়া বোলারদের তোপে ১৪৯ রানের পরাজয় দেখেছে সাকিব আল হাসানের দল। টাইগার ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে সম্ভাবনা জেগেছিল রেকর্ড পরাজয়ের। ৮১ রানে ৬ ব্যাটারকে হারানোর পর ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন। সেই সঙ্গে এড়িয়েছেন টাইগারদের রেকর্ড রানে পরাজয়ের শঙ্কাও।
একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয় ছিল ২৩৩ রানে। ২০০০ সালে এশিয়া কাপের ম্যাচে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্ট্রেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৩৩ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ৩২০ রান তাড়ায় নেমে ৮৭ রানে গুটিয়ে যায় টাইগার বাহিনী।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয় ছিল ২০৬ রানে। ২০১১ বিশ্বকাপে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই পরাজয়টি দেখেছিল টিম টাইগার্স। মিরপুরে ম্যাচটিতে টসে জিতে আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান করে প্রোটিয়ারা। ২৮ ওভার ব্যাট করে ৭৮ রানে সবকটি উইকেট হারায় বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ১১১ বলে ১১১ রানের অনবদ্য ইনিংসে পরাজয়ের দুটি রেকর্ডই এড়িয়েছে বাংলাদেশ।
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে টসে জিতে আগে ব্যাটের সিদ্ধান্ত নেন প্রোটিয়া অধিনায়ক এইডেন মার্করাম। টাইগার বোলারদের পিটিয়ে নির্ধারিত ওভার শেষে ৫ উইকেটে ৩৮২ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে দলটি। জবাবে নেমে ৪৬.৪ ওভারে ২৩৩ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।
বড় সংগ্রহ টপকাতে নেমে কিছুটা সাবধানী হয়ে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। দেখেশুনে ব্যাট করছিলেন দুই ওপেনার লিটন দাস ও তানজিদ হাসান তামিম। উদ্বোধনী জুটিতে ৩০ রান তোলেন দুজনে। এরপর ধস নামে টাইগার ব্যাটিং লাইনআপে। পাওয়ার প্লে-তে হারায় তিন ব্যাটারকে।
সপ্তম ওভারে জোড়া আঘাত হানেন মার্কো জানসেন। ওভারের প্রথম বলে তানজিদকে ফেরান জানসেন। ১৭ বলে ১২ রান করছেন তানজিদ। দ্বিতীয় বলে ব্যাটে আসেন নাজমুল হোসেন শান্ত। লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে উইকেটরক্ষক হেইনরিখ ক্লাসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান রানের খাতা না খুলেই।
শান্ত’র ‘গোল্ডেন ডাক’র পর টিকতে পারেননি সাকিব আল হাসানও। পরের ওভারে লিজার্ড উইলিয়ামসের শিকার হন সাকিব। ৪ বল খেলে ক্লাসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে করেন ১ রান।
১১.৫ ওভারে দলীয় ৪২ রানে মুশফিকের উইকেটও হারায় বাংলাদেশ। ১৭ বলে ৮ রান করে জেরাল্ড কোয়েটজির শিকার হন মুশফিক। ১৫তম ওভারের শেষ বলে লিটনকে ফেরান কাগিসো রাবাদা। ৪৪ বলে ২২ রান করেন টাইগার ওপেনার।
লিটন ফেরার পর একপ্রান্ত আগলে রাখেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। একে একে বিদায় নেন মেহেদী হাসান মিরাজ ১৯ বলে ১১ রান, নাসুম আহমেদ ১৯ বলে ১৯ রান ও হাসান মাহমুদ ২৫ বলে ১৫ রান করে। টাইগার ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে ৩৫তম ওভারের তৃতীয় বলে ফিফটি পূর্ণ করেন রিয়াদ। ৬৭ বলে ফিফটি ছোঁয়া ইনিংসে ছিল ছয়টি চারের মার।
১৫৯ রানে অষ্টম উইকেট হারানোর পর মোস্তাফিজকে নিয়ে ৪২তম ওভারে দলের দুইশত রান পূর্ণ করেন রিয়াদ। ৪৪.২ ওভারে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ৪৫.৪ ওভারে দলীয় ২২৭ রানে কোয়েটজির শিকার হন মাহমুদউল্লাহ। ১১টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১১১ বলে ১১১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন টাইগার অলরাউন্ডার।
৪৭তম ওভারের চতুর্থ বলে মোস্তাফিজকে ফিরিয়ে টাইগারদের ইনিংস গুটিয়ে দেন লিজার্ড উইলিয়ামস। ২১ বলে ১১ রান করেন মোস্তাফিজ। ৪ বলে ৬ রানে অপরাজিত থাকেন শরিফুল।
প্রোটিয়াদের হয়ে তিনটি উইকেট নেন জেরাল্ড কোয়েটজি। মার্কো জানসেন, কাগিসো রাবাদা ও লিজার্ড উইলিয়ামস নেন দুটি করে উইকেট। এছাড় কেশব মহারাজ নেন একটি উইকেট।
প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বল হাতে শুরুটা ভালোই করেছিল বাংলাদেশ। ৩৬ রানে ২ উইকেট তুলে নেয় টাইগার দল। মোস্তাফিজুর রহমানকে দিয়ে বোলিং আক্রমণের সূচনা করেন সাকিব আল হাসান। দ্বিতীয় ওভারে আনেন স্পিনার। মেহেদী হাসান মিরাজ হাতে তুলে নেন বল। ওই ওভারের পঞ্চম বলে স্লিপে সহজ ক্যাচ ফেলেন তানজিদ হাসান তামিম। রানের খাতা খোলার আগেই রেজা হেনড্রিক্স জীবন পান।
পঞ্চম ওভারে ছন্দে থাকা মোস্তাফিজকে সরিয়ে শরিফুল ইসলামকে আক্রমণে আনেন দ্রুত উইকেট পাওয়ার সন্ধানে থাকা সাকিব। প্রথম ওভারে ৭ রান দিয়ে দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই সাফল্য পান শরিফুল। হেনড্রিক্সকে বোল্ড করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নেচে উদযাপন করে নজর কাড়েন।
অষ্টম ওভারের প্রথম বলে এক রান করা ডুসেনকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে সাজঘরে পাঠান মিরাজ। দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে সাউথ আফ্রিকা চাপে পড়ে। হাল ধরেন ডি কক ও মার্করাম। ১৩১ রানের জুটি গড়েন দুজনে। ৩১তম ওভারের চতুর্থ বলে মার্করামকে ফেরান সাকিব। লংঅনে লিটনের হাতে ক্যাচ দেয়ার আগে ৭ চারে ৬৯ বলে ৬০ রান করে যান প্রোটিয়া অধিনায়ক।
৩৫তম ওভারের প্রথম বলে আসরে নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ডি কক। আগে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তারকা ওপেনার। ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ১০১ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ডি কক।
পরে হেইনরিখ ক্লাসেনকে নিয়ে ঝড় তোলেন ডি কক। ৪২.৫ ওভারে ফিফটি পূর্ণ করেন ক্লাসেন। ৩৪ বলে ফিফটি ছোঁয়া ইনিংসে ছিল ৪ ছক্কা ও একটি চারের মার। ৪৫.১ ওভারে উড়তে থাকা ডি কককে ফেরান হাসান মাহমুদ। ১৫ চার ও ৭ ছক্কায় ১৪০ বলে ১৭৪ রানের ইনিংস খেলে যান প্রোটিয়া ওপেনার।
ডি কক ফেরার পর ডেভিড মিলারকে নিয়ে চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে ঝড় তোলেন ক্লাসেন। ৪৯.২ ওভারে ৮ ছক্কা ও ২ চারে ৪৯ বলে ৯০ রান করা ক্লাসেনকে ফেরান হাসান। মার্কো জানসেনকে নিয়ে ইনিংস শেষ করেন ডেভিড মিলার। ৪ ছক্কা ও এক চারে ১৫ বলে ৩৪ রানে অপরাজিত থাকেন মিলার, জানসেন ১ বলে ১ রানে।
বাংলাদেশের হয়ে দুটি উইকেট নেন হাসান মাহমুদ। শরিফুল ইসলাম, সাকিব আল হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ একটি করে উইকেট নেন।







