চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হলেও বাস্তব পরিবর্তন এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই জনগোষ্ঠী আজও কম মজুরি, সীমিত সুযোগ এবং সামাজিক বঞ্চনার মধ্যেই রয়ে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় চা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দাননির্ভর বা খণ্ডিত উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত, টেকসই ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা।
সরকার ইতোমধ্যে চা শ্রমিকদের জন্য জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, শিক্ষা উপবৃত্তি ও কিছু সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে কঠিন বাস্তবতা হলো—চা শ্রমিকদের বর্তমান বেতন কাঠামো এতটাই সীমিত যে শুধু এসব সহায়তার মাধ্যমে তাদের পরিবারকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব নয়। ফলে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা ছাড়া জীবনমান উন্নয়নের অন্য কোনো কার্যকর পথ নেই।
দক্ষতা উন্নয়ন: পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি
চা বাগানগুলো সাধারণত শহর ও শিল্পাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থিত। এর ফলে শ্রমিক পরিবারের তরুণ প্রজন্ম বাইরের কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা বাজার চাহিদা সম্পর্কে জানতেই পারে না। এই ব্যবধান দূর করতে দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক প্রশিক্ষণ সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
নার্সিং ও কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং ও অটোমোবাইল মেকানিক, ইলেকট্রিক্যাল ও মোবাইল সার্ভিসিং, বিউটিফিকেশন ও হেয়ার ড্রেসিং, অর্গানিক ফার্মিং কিংবা ভার্মি কম্পোস্ট—এ ধরনের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ চা শ্রমিক পরিবারের তরুণদের জন্য দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এসব প্রশিক্ষণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষমতায়নও নিশ্চিত করবে।
পাশাপাশি দর্জির কাজ, হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ও মৎস্য চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার মতো প্রশিক্ষণ পরিবারভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগ চা শ্রমিকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী আয়ের পথ তৈরি করবে।
জব প্লেসমেন্ট সেন্টার: সুযোগ ও মানুষের মাঝে সেতুবন্ধন
দক্ষতা অর্জনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপযুক্ত চাকরির সংযোগ। এ ক্ষেত্রে চা বাগানভিত্তিক বিশেষায়িত ‘জব প্লেসমেন্ট সেন্টার’ বা ‘ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেল’ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এসব কেন্দ্র সরকারি ও বেসরকারি চাকরির তথ্য বাগান এলাকায় পৌঁছে দিতে পারে, বিভিন্ন শিল্পখাতের সঙ্গে তরুণদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে এবং ইন্টারভিউ, যোগাযোগ দক্ষতা ও জীবনবৃত্তান্ত তৈরির মতো সফট স্কিল প্রশিক্ষণ দিতে পারে।
এ ধরনের কেন্দ্র থাকলে অনেক মেধাবী তরুণ শুধু তথ্য ও দিকনির্দেশনার অভাবে যে সুযোগ হারায়, তা আর হবে না।
নিরাপদ বিদেশগমন: দালালমুক্ত পথের প্রয়োজন
চা শ্রমিক পরিবারের অনেক তরুণ বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী হলেও উচ্চ খরচ ও দালালদের দৌরাত্ম্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জব প্লেসমেন্ট সেন্টার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি সংস্থা যেমন বিএমইটি বা বোয়েসেলের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসনের তথ্য পৌঁছে দেওয়া, প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা (জাপানি, কোরিয়ান, আরবি), স্বীকৃত কারিগরি সার্টিফিকেট সংগ্রহে সহায়তা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে অনেক পরিবার বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাগান এলাকায় উন্নত স্কুল, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং উচ্চশিক্ষার জন্য উপবৃত্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনতে পারে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য বীমা চালু করা জরুরি। সামান্য প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্য বীমা থাকলে বড় অসুস্থতায় পরিবারগুলো আর সর্বস্বান্ত হবে না। নারীদের নিয়ে সমবায় সমিতি গঠন করলে সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে তাদের আর্থিক নিরাপত্তাও বাড়বে।
সমন্বিত উদ্যোগই পরিবর্তন আনতে পারে
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার, বেসরকারি সংস্থা, এনজিও ও চা বাগান মালিকপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তরিক বাস্তবায়ন হলে চা শ্রমিকদের পরবর্তী প্রজন্ম আর শুধু চা বাগানের শ্রমিক হয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তারা দেশের মূলধারার অর্থনীতিতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে অবদান রাখতে পারবে।
চা শিল্পের ভবিষ্যৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের ভবিষ্যৎ। এখনই সময় দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে চা শ্রমিকদের জন্য সম্মানজনক, স্বাবলম্বী ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









