বিশ্বের দুই প্রধান সয়াবিন রপ্তানিকারক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সয়াবিনের গুণগত মানে স্পষ্ট পার্থক্য উঠে এসেছে। ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (USSEC) প্রকাশিত সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তেল ও প্রোটিনের মাত্রায় ব্রাজিলে উৎপাদিত সয়াবিন এগিয়ে থাকলেও আর্দ্রতা ও ক্ষতিগ্রস্ত দানার হার তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে মার্কিন সয়াবিনে।
প্রতিবেদনটি ২০২৪–২৫ মৌসুমে রপ্তানিকৃত সয়াবিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সরকারি ফেডারেল গ্রেইন ইনস্পেকশন সার্ভিস (FGIS)–এর তথ্য এবং ব্রাজিলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সার্ভেয়ারদের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
আর্দ্রতা ও কম ক্ষতিগ্রস্ত দানার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে
ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মোট রপ্তানিকৃত সয়াবিন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রাজিলীয় সয়াবিনে গড় আর্দ্রতা মার্কিন সয়াবিনের তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ব্রাজিলীয় সয়াবিনে মোট ক্ষতিগ্রস্ত দানার হার ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।
বিশেষ করে হিট ড্যামেজ ও মোট ড্যামেজ সূচকে ব্রাজিলীয় সয়াবিনের মান তুলনামূলকভাবে কম অনুকূল। অন্যদিকে, মার্কিন সয়াবিনে মোট ক্ষতিগ্রস্ত দানার গড় হার মাত্র ১ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেশ ভালো হিসেবে বিবেচিত।
তেল ও প্রোটিনে ব্রাজিলের আধিপত্য
তবে তেল ও প্রোটিনের দিক থেকে ব্রাজিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রাজিলীয় সয়াবিনে গড় প্রোটিনের মাত্রা মার্কিন সয়াবিনের তুলনায় ০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি এবং তেলের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।
এই বৈশিষ্ট্য ব্রাজিলীয় সয়াবিনকে ভোজ্যতেল উৎপাদন ও উচ্চ প্রোটিনভিত্তিক পশুখাদ্য শিল্পে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এক বছরের ব্যবধানে কী বদলেছে
ডিসেম্বর ২০২৫ এবং ডিসেম্বর ২০২৪–এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রাজিলীয় সয়াবিনে আর্দ্রতা আগের বছরের তুলনায় কমেছে ০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে, মার্কিন সয়াবিনে একই সময়ে আর্দ্রতা বেড়েছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তেলের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। ব্রাজিলীয় সয়াবিনে ডিসেম্বর ২০২৫–এ তেলের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। তবে মার্কিন সয়াবিনে তেলের পরিমাণ একই সময়ে কমেছে।
ভাঙা দানা কমেছে দুই দেশেই
ইতিবাচক দিক হিসেবে উভয় দেশেই ভাঙা দানার হার (Splits) উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ডিসেম্বর ২০২৫–এ ব্রাজিলীয় সয়াবিনে ভাঙা দানা কমে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে, আর মার্কিন সয়াবিনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশে।
বাজারে প্রভাব কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, এই গুণগত পার্থক্য আন্তর্জাতিক সয়াবিন বাজারে ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব শিল্পে তেল ও প্রোটিনের মাত্রা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ব্রাজিলীয় সয়াবিনের চাহিদা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, কম ক্ষতিগ্রস্ত ও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মানের কারণে পশুখাদ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে মার্কিন সয়াবিন এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্ববাজারে খাদ্য ও পশুখাদ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায়, সয়াবিনের গুণগত মান নিয়ে এই প্রতিযোগিতা আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান চ্যানেল আইকে বলেন, ‘এই সময়ে এসে সয়াবিনের ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রই তুলনামূলক ভালো মনে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাণীখাদ্যের জন্য যে মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন থেকে পাচ্ছি। ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (USSEC) আমাদের এ ক্ষেত্রে নানা ভাবে সহায়তা করছে। সর্বোপরি এখন পর্যন্ত আমাদের মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন আমাদের জন্য লাভজনক।’
সব মিলিয়ে, সয়াবিনের গুণগত মান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের এই তুলনায় বিশ্ব কৃষিপণ্য বাজারে প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।











